গত দুবছর প্রায় ৪ বার গিয়েছি সুন্দরবন , প্রতিবারই দিদিরবাড়ি যাওয়াটাই উপলক্ষ হলেও সুন্দরবনটাই কারন ছিল ।
●তো যেহেতু প্রায় সব দিকেই হাত পাকানোর চেষ্টা চলছে ,তাই এই প্রথম ভ্রমন কাহিনী লিখতে চললাম
ভুল ত্রুটি মার্জনীয় ।।
◆সকাল ৯ টায় বাড়ি থেকে বার হলাম , ফেবুতে পোস্ট করেলাম কিছু ভালো জার্নি সঙ এর খোঁজ দিতে , প্রিয় বন্ধু গুলো ললিপপ লাগালু , ধীনচ্যাক পূজা সাজেস্ট করল । একজন এর দৌলতে বেশ কিছু সুন্দর গান পেলাম ।


কানে হেডফোন পুরে বসিরহাটের ৭২ নম্বর বাস্ট্যান্ড থেকে উঠে পরলাম ধামাখালি গামী বাসে , ১ ঘন্টার একটু বেশি সময় নিলো মালঞ্চ পৌঁছাতে । সেখানে নেমে একটু অপেক্ষা করতেই আসলো সোনাখালি যাওয়ার DA24 বাস । উঠে দেখি কয়েকটা সিট খালি , বসতে যাবো , এমন সময় একদল বাচ্ছা মেয়ে আসলো , তাই সিট ছেড়ে দিলাম , মুখে হাসি থাকলেও মনে একটু বিষাদ ছিলো ! সামনের ২ ঘন্টার রাস্তা দাঁড়িয়ে যেতে হবে নাকি !? ..
কিন্তু ভাগ্য ভালো , একজন মিনিট ১৫ পরই নেমে গেলো ও সিটটি আমি পেলাম । জানলার ধারের , হেডফোন আবার লাগলাম । এবার আর গান নয় , রাসকিন্ড বন্ডের কিছু গল্পের সানডে সাসপেন্স রূপান্তর । বাস তখন সড়বেড়িয়ে ছাড়িয়ে গ্রামের রাস্তা নিয়েছে । আর আমার হাল্কা ভয় করাও শুরু হয়েছে । কতক্ষন চোখ বুঝে গল্প শুনছিলাম জানি না , হটাৎ চোখ খুলতে দেখি এক পোস্টার , " ওয়েলকাম টু সুন্দরবন " ! যাক বাঁচা । তারপর ৩০ কিলোমিটার গ্রামের মধ্যে শুরু রাস্তা ঝড়ের গতিতে পর করে ১২:৩০ এর দিকে নামলাম সোনাখালি ।
এখান থেকে দুদিকে রাস্তা ভাগ । একটি দিক গেছে বাসন্তী হয়ে ঝড়খালী এবং আরেকটি দিক ক্যানিং ।
আমার গন্তব্য বাসন্তী অর্থাৎ দিদির বাড়ি । সোনাখালি থেকে টোটো ধরে ব্রীজ পার হয়ে বাসন্তী পৌঁছলাম । অপূর্ব জায়গা , ঝাউগাছ , বেশ কয়েকটি চার্চ দেখে মন জুড়িয়ে যায় ,, শেষমেশ পৌঁছলাম দিদির বাড়ি । সেদিন টা ওখানেই বিশ্রাম , সন্ধ্যায় বাইকে করে বাসন্তীতে এসে আমার বিখ্যাত কাটলেট খাওয়ার কাহিনী আর বললাম না ।
পরদিন সকাল ১১ টায় জামাইবাবুর বাইক নিয়ে আমি আর দিদি রওনা দিলাম ঝরখালীর উদ্দ্যেশে
বাইকে ১ ঘন্টা লাগে , বাসন্তী থেকে ঝকঝকে রাস্তা , চারিদিকে খালি মাঠ আর মাঠ , এবং নানা প্রকার গাছ ,, ও দুয়েকটা করে খড়ের চালের মাটির বাড়ি । মোন ভাবিয়ে তোলে এ দৃশ্য । কিন্তু যেটা আমাকে সবচেয়ে অবাক করে তা হলো ওই ২২ কিলোমিটার রাস্তায় অন্তত ১৫ টা হাই স্কুল এর উপস্থিতি ! শিক্ষার বিস্তার ঘটুক ।
মাঠ পার করে ক্রমশ জনগকের দিকে এসে পড়লাম , তখন রাস্তার চারিপাশে জাল দিয়ে উঁচু করে ঘেরা , ভাবলাম এই বাঁধা কি যথেষ্ট দ্য রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে আটকাতে !?
ক্রমে জঙ্গল গাঢ় হলো , রাস্তার দুপাশে সুন্দরী গাছ , শ্বাসমূল দেখা যায় ।

শেষে এসে পৌঁছলাম ঝড়খালী কোস্টাল থানার একটু আগে এক বড়ো মাঠের সামনে , সেখানে গোটা ৪ এক ভলবো বাস বেশ কয়েকটা স্কর্পিও , বাইকটি সেখানে গ্যারেজ করে হাটা পথ ১০ মিনিটের , । দিদির সাথে গল্প করতে করতে পৌঁছে গেলাম প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে । সাইনবোর্ড নজরে পড়লো , "বিওয়ার অব মানকিজ " .. আগের তিন বার অফ সিজনে এসেছিলাম তাই ভিড় বলতে কিছুই টেরপাইনি , স্থানীয় লোক ছিলো খালি !! এবার চক্ষু চড়কগাছ ! প্রচুর লোক , নানা ভাষার ! লোকে লোকারণ্য ! সাধেই কি একে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বলে !?
হাটতে হাটতে চলে গেলাম নদীর ঘাটে , পাথরের লম্বা সিঁড়ি লঞ্চ বোট আসা যাওয়ার জন্য , দুটো ঘাটে প্রায় ১৫ টা লঞ্চ বোট ! লোক নামছে উঠছে , !
[Image 36.jpg]
আমি নিস্তব্দ ভাবে দাঁড়িয়ে সব অনুধাবন করতে থাকলাম , মা বাবার সাথে এসেছে ছোট্ট বছর সাতের মেয়ে , সেতো ওই নফির দিকে তাকিয়েই অবাক ,, "এতো জল !?" মাকে জিজ্ঞেস করল ? পরক্ষণেই বাবাকে প্রশ্ন ! "বাবা বাঘ দেখব কখন ?"
পাশে দেখি কিছু শহুরে কন্যা মেকআপ কীট খুলে ফ্রন্ট ক্যামেরায় সৌন্দর্য ঠিক করতে ব্যস্ত ! আজব সত্যি ! কোলাহল এ চিৎকার , ব্যস্ততা মেশানো , অসম্ভব লঞ্চ ভাড়ার জন্য একদল শিক্ষিত ভদ্র বাবুরা বোট কর্তাদের গালি সহ ধমক দিচ্ছেন !!
[Image 38.jpg]
হটাৎ ভিড় ঠেলে চোখ গেলো একটি ছেলের দিকে , পিছন ফিরে সে প্রকৃতিকে লেন্স বন্ধি করছিলো !
"আরে আশিক না !?" ছুটে গেলাম । "ভাই তুই এখানে !?" " হ্যায় রে কলেজ থেকে এসেছি !"
প্রায় বছর পর দেখা ! ওদের কলেজের প্রফেসর আমায় ওদের সঙ্গে লঞ্চে করে যেতে বললেও দিদি থাকায় রাজি হলাম না ।
ক্রমে জলে ঢেউ তুলে সেটিও নদীর বাকে মিলিয়ে গেলো !

"কিরে এখানেই থাকবি না কিছু খাওয়াবি !? "
দিদির এ হেন মন্তব্যে আমার ও খিদেটা পেয়ে বসল
পেটের নয় , মনের খিদে ! চিপস , বেগুনি , ডিম সেদ্ধ , আইস্ক্রিম এবং শেষপাতে আখের রস খেয়ে ঢেঁকুর তুলে খ্যান্ত হলাম । না এখানে কাটলেট পাওয়া যায় না , !!...
খাওয়া শেষে একটু কেনা কাটা করা হলো , সাহেবি টুপি এবং সুন্দর কয়েকটা চাবির রিং কিনলাম ।
এবা
র সেই আসল উদ্দেশ্য ! বাঘ দেখা , না পাড়ে দাঁড়িয়ে ঝাপসা খাড়ির দিকে তাকালে বাঘ দেখতে পাবেন না ! লঞ্চে চড়লে ভাগ্য ভালো থাকলে দেখা পেতে পারেন । কারন তেনারা এই সেল্ফি প্রিয় মানুষ এর সাক্ষাৎ করতে আর এদিকে আসে না খুব একটা !!
যাই হোক উপায় আছে । ঝড়খালী ব্যাঘ্র সংরক্ষণ কেন্দ্র । পাশেই ! সুন্দর একটি ফুলের বাগান , ভিতরে একখানি ফুটবল মাঠের ন্যায় বড়ো খাঁচা । তার ভিতরেই আছে দুই মহারাজ ।
[Image 47.jpg]
একখানি বহুদিনের , অপরটি সদ্য আনা হয়েছে জঙ্গল থেকে ! তাই তাকে তখনো বশ করা যায়নি । মাঝে মাঝেই সে হুঙ্কার ছাড়ছে । আর অন্যটা ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ! দেখে ভয় লাগে না , রোগা হয়ে গেছে , ডাকেও সে জোর নেই ! সবাই ফটো তুলতে ব্যস্ত !
আমার করুণা হলো ..তাই বিরক্ত না করে চলে আসলাম খাঁচার অন্য পাশে ।
আমাদের সত্যি কপাল ভালো ছিলো তাই দেখতে পেলাম সাদা কুমির । বইয়ে পড়েছিলাম কুমিরের রোদ পোয়ানোর গল্প । কিন্তু না দেখলে বিশ্বাস হয়না যে মড়ার মতো করে সে রোড পয় ! চোখ দুটো খোলা তো খোলাই ! শরীরে এতটুকু অস্থিরতা নেই ! নিঃশ্বাসের জন্য গলা কাঁপতে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না ওটা আসল কুমির , আমাদের ১০ ফুটের মধ্যে !!

ভ্রমণ সার্থক । ফেরার পালা , দিদিকে নিয়ে বাইকে করে ফিরে এলাম বাসন্তী ।
দুদিন ছিলাম সেখানে , অতি কষ্টে ২g নেটওয়ার্ক দ্বারা দুখানি পোস্ট করেছিলাম প্রিয় কাটলেট নিয়ে।
পর দিন ফেরার পালা , সোনাখালি থেকে দিঘা গামী ভলবো বাসে যখন উঠলাম তখন ৮ টা ।
বাসে বসেই প্রিয় বন্ধুর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে ফোন সারার পরই হটাৎ বাস থেমে যাওয়া সামনে দেখি প্রচুর লোক আর অসংখ্য গাড়ি , সহযাত্রীদের থেকে শুনলাম , গতকাল এখানে তিনটি খুন হয়েছে । হ্যা এক স্কুল পড়ুয়া সহ তিনজন বাসন্তীর সড়বেরিয়া অঞ্চলে । নামলাম বাস থেকে , ড্রাইভার বলল বাস যাবে না , কন্ডাক্টরকে তখন ঘিরে ধরেছে অন্যান্য যাত্রীরা , ভাড়া ফেরত চাই ! আমি কোলাহলের দিকে এগিয়ে গেলাম । ২৪ ঘন্টার একটি নিউজ গাড়ি ও দাঁড়িয়ে , মাথায় এত্তোবড়ো ডিস ! বুঝলাম লাইভ নিউজ , ফেবু লাইভের মতো অতটা সহজ নয় ! স্থানীয় লোকরা আমাদের স্বতর্ক করে দিলো না এগোতে , ক্যানিং হয়ে ট্রেনে করে যেতে বললো । কিন্তু সে ঘুর পথ , ড্রাইভার ঘটকপুকুর হয়ে যেতে চাইলেও পরে আর নড়ল না ।
অগত্যা কিছু ভাড়া ফেরত পেয়ে আমি আর এক বসিরহাট যাওয়া যাত্রী হাঁটতে হাঁটতে আসতে লাগলাম । সাইরেনের শব্দ করে হুহু করে পাশ দিয়ে চলে গেল গোটা দশেক পুলিশের গাড়ি , একদল মিলিটারি ফোর্স ও গেলো ! বুঝলাম বিপদ ,, দাঁড়িয়ে গেলাম আমরা ।
প্রায় আধঘন্টা পর বিপরীত দিক থেকে বাস , অটো আসতে লাগল , বুঝলাম অবরোধ উঠে গেছে । সেখান থেকে ধামাখালীর বাসে চেপে বসিরহাট নামলাম ১ টায় !! দেশে ফেরার শান্তি অনুভব হলো ।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম ।।।।