- হ্যাঁ এখন একটু ব্যস্ত থাকি আজকাল । বাবা ব্যবসায়
ঢুকিয়ে দিয়েছে ।
- ভালো তো ! কামাই কর এবার দুহাত দিয়ে !
- আর কামাই ! নানা ঝামেলায় ব্যবসা লাটে উঠেছে । তোর
খবর কি ?
- এই তো চলছে । নতুন চাকরী উপভোগ করছি । সেই কলেজের
পর থেকে তোর সাথে আর দেখা হয়নি। সামনে বড়দিনের ছুটি। ভাবছি তোর ওখানে কদিন যাব ।
এই শহরের ক্যাঁচক্যাঁচানি থেকে কদিন একটু দূরে থাকতে চাই ।
- বাহ বেশ তো ! চলে আয় একদিন। সেই পাঁচবছর হল তোকে
শেষবার দেখেছি ।
জমিয়ে আড্ডা মারা যাবে !
- অবশ্যই মাই ফ্রেন্ড । পরের সপ্তাহে তবে দেখা হচ্ছে !
- একদম! রাখছি এখন । ভাল থাকিস । বাই।
-বাই !
ফোনটা
কেটে দিল অমিত । বহুদিন পর প্রিয় বন্ধুর সাথে
দেখা হবে এই ভেবেই সে ভীষণ খুশি ।
ঘোড়াডাঙা স্টেশনে যখন
নামল তখন সকাল ৯টা । ঠাণ্ডাটা বেশ ভালই পড়েছে ।একেবারে ফাঁকা জায়গায় স্টেশন
। তিন চারজনের বেশি কেউ নামল
না । এক পাশে চাষের জমি অন্যপাশে
মাঠ, গাছের
সারির পাশ রাস্তা। বলতে
গেলে চোখ জুড়ানো পরিবেশ । স্টেশন থেকে নামতেই সমীরের সাথে দেখা! ‘ কি ভাই কেমন আছিস’ বলে জড়িয়ে
ধরল । আগের থেকে দুজনেই একটু মোটা হয়েছে। দুই বন্ধুর আবেগময় ভাব বিনিময়ের পর সমীর
দূরে দাঁড়ানো ভ্যানটাকে দেখিয়ে বলল, চল যাওয়া যাক !
দুপাশের বড় বড় বট আর আমগাছে ভর্তি রাস্তা
দিয়ে যেতে লাগল তারা। পাশের মাঠটিও বেশ বড় হাফ মাইল তো হবেই । অমিত কলেজে পড়ার সময়
একবার এসেছিল তেমনই আছে সব । পাল্টেছে যেটা তাহলো সমীরের পাড়ার লোকসংখ্যা । আগে
বেশ জমজমাট পাড়া ছিল । এখন সর্বসাকুল্যে গোটা ছয় সাত বাড়ি রয়েছে । সবই ছোট ছোট
সরকার থেকে দেওয়া পাকা বাড়ি । সমীরদের বাড়িটা বেশ পুরনো এবং বড় । প্রায় ৭০ বছর পুরনো
তো হবেই । পাড়ার এই হাল কেন জিজ্ঞেস করতে
সে বলল, ‘আরে গ্রামে থেকে কি করবে ! এখানে তো আর তেমন সুবিধা নেই। একটু লেখাপড়া শিখেই
শহরে কাজ জুটিয়ে নিচ্ছে । পড়ে এসে বাবা মা কেও নিয়ে যায় আর ঘরগুলো তালা পড়ে থাকে।
বাবার ব্যবসাটা এখনো চলছে বলে আমার এখানে থাকা।‘ উঠানে ছাগল দেখে অমিত একচোট হেসেই
নীল ! একি রে! তোরা কি এখন ছাগল পুষছিস ?
সমীর একটু মুচকি হেসে বলল, হ্যাঁ ভাই !
দুপুরে খাসির মাংস আর ভেটকি মাছের তরকারি
খেয়ে দুই বন্ধু সুখের ঢেকুর তুলতে তুলতে পুকুর পাড়ে গিয়ে বসল । ইতিমধ্যে মাসিমার
যত্ন আত্তির ঠেলায় অমিত অস্থির হয়ে উঠেছে । আসা থেকেই শুধু খাওয়া !
-বুঝলি
সমীর, এবার থেকে এখানে এলে আগের দুদিন উপোষ করে আসবো , বুঝলি?
- তোদের বাড়িতে গেলেও তো ছাড়িস না ।
ক্রমশ
আড্ডা চলতে লাগল । কলেজের কত পুরনো কথা । ইতিমধ্যে কয়েকজন এসে পুকুর থেকে স্নান
করে গিয়েছে । তারা অমিত কে দেখে যেন একটু
অবাক হল । মনে হল তাদের মনে বুঝি কিছু
একটা আছে। কয়েকজন যেন একটু ভীত । শীতের দুপুর কখন যে বিকাল হয়ে যায়
তার ঠিক নেই ! আর বিকাল হলেই তো সন্ধ্যে । সাড়ে তিনটে বাজতেই সমীর হঠাৎ বলে
উঠল, তোর কটায় ট্রেন ? অমিত একটু
আশ্চর্য হয়ে গেল ! সে তো আজ ফিরবে বলে আসেনি । সমীর কি সেটা বোঝেনি ? কিন্তু এমন কেউ বললে তো কিছু করার নেই । জোর
করে থাকা যায় না । বলল ,এই তো সাড়ে ছটার দিক ।
আরো কিছুক্ষণ গল্প করার পর সমীর হঠাৎ বলে
উঠল চল ভাই যাওয়ার আগে আমার ঠাকমার সাথে দেখা করিয়ে দেই । ঠাকমার কথা ভুলেই
গিয়েছিল এতক্ষণ অমিত । আগের বার যখন এসেছিল তখন খুব যত্ন করেছিল । দাদুভাই বলে
ডাকতেন । ‘হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই চল !’ বলে
দুজনেই বাড়ির দিকে গেল । সমীরদের বাড়িটা ছিল দুতলা নিচের তলায় দুটো ঘর ওপরের তলায়
দুটো ।তারা ওপরেই থাকে বলে সোজাসুজি ওপরে
গিয়েছিল । এখন নিচের তলায় ঠাকমার ঘরের দরজাটা খুলে দিল সমীর । ঠাকুমাকে দেখে কষ্ট
হল অমিতের । বিছানার এক কোণে শুয়ে রয়েছেন । শীর্ণ শরীর । মনে হয় বিছানার সাথে মিশে
গেছেন । ‘ও ঠাকমা, চিনতে পারছ ? অমিত
এসেছে। ওকে মনে আছে ?’ চেঁচিয়ে বলল সমীর ।
ঠাকমা কোন উত্তর দিল না । শুধু একবার তাকালো । চোখ গুলো কোটরে ঢুকে গেছে ।
মনে হয় চিনতে পারেনি ! অমিতের মনটা বড্ড খারাপ হয়ে গেল ! কি প্রাণচঞ্চল ছিলেন আর
এখন কি অবস্থা ! হাতে দড়ি বাধার দাগও দেখা গেল ।
সমীর বলল, ক্যান্সারে ভুগে ভুগে এই অবস্থা !এখন মৃত্যুর অপেক্ষা করা ছাড়া
কিছু পথ নেই। মাঝে মাঝে জ্বালাতন করলে দড়ি বেঁধে খাওয়াতে হয় !
- ঠিক আছে বাবা আবার এসো কিন্তু ! এইবলে হাসি মুখে বিদায় জানালেন সমীরের মা
।ভ্যানে করে এসে সন্ধ্যার আগে স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে চলে যায় সমীর । ট্রেন আসতে এখনো
আধঘণ্টা । একটা
চায়ের দোকানে বসল অমিত । চা খেয়ে পকেট থেকে সিগারেটটা বার করে টানতে লাগল । বেশ ঠাণ্ডা
তো পড়েইছে তারওপর মনুষ্যহীন এলাকা । ঠাণ্ডা কাঁপুনি ধরিয়ে দেয় । কলকাতায় এসব বোঝাই
যায় না । হারিকেনের আলোর সামনে বসে অনেক কথা
মনে পড়ছিল অমিতের । সমীরের কতটা পরিবর্তন হয়ে গেছে! নিজের বন্ধুকেও সে বের করে
দিতে পারলে খুশি হয় । এমনকি ট্রেন আসা অবধিও অপেক্ষা করল না সে অথচ শেষবার যখন
এসেছিল –
-
আর এক কাপ চা দেব বাবু? আচমকা ধীর কণ্ঠে বলে
উঠলেন বৃদ্ধ দোকানদার ।
- ন-না থাক ।
- তাহলে বাবু উঠবেন ? আমি দোকান বন্ধ করব এইবার ।
-এত জলদি ?
- কার জন্য খুলে রাখব বলুন? দেখছেন তো এতবড় স্টেশনে আমি
আপনি আর স্টেশন মাস্টার ছাড়া কেউ নেই !
- তা বটে ! বলে দামটা চুকিয়ে বেরোতে যাবে এমনসময় বৃদ্ধ বললেন , আপনি
সদানন্দ চাটুজ্যের বাড়িতে উঠেছিলেন না ?
-হ্যাঁ , কেন ?
-ওইজন্য ! আপনাকে সন্ধ্যার আগেই পার করে দিয়েছে ।
-ব্যাপারটা কি একটু খুলে বলবেন ?
ভদ্রলোক
হেসে বললেন ,আপনার ট্রেন টাইম হয়ে গেছে বাবু ।
ঘড়ির
দিকে তাকিয়ে অমিত বলল,
এখনো পনেরো মিনিট । আপনি বলুন ।
বৃদ্ধ
বেঞ্চিতে বসে একটা বিড়ি ধরালেন । তারপর বলা শুরু করলেন , সদানন্দ মানে আপনার বন্ধু সমীরের বাবা এলাকায়
বেশ সম্মানীয় । ভাল
ব্যবসা আছে বাজারে । সন্তান
বৌ আর মাকে নিয়ে বেশ সুখী পরিবার ছিল । কিন্তু আসল ঘটনার শুরু বহু আগে । স্কুলে পড়ার সময় কোন তান্ত্রিকের পাল্লায়
পড়ে সে চলে যায় । আবার দু বছর পরে ফিরে আসে
। লোকে বলে সে নাকি বাবা মার
মায়া ত্যাগ করতে পারেনি । এসে
দেখে বাবা মৃত । ব্যবসা কোনরকমে চলছে । তখন ব্যবসার দায়িত্ব নিয়ে আবার দাঁড়
করালেন। কিন্তু বাবা মায়ের এই পরিণতির
জন্য নিজে অপরাধ বোধে ভোগেন । এরপর থেকে মা কে কখনও চোখের আড়াল করেননি । মা যা যা চেয়েছেন বা বলেছেন সব করে
গেছেন । এমনকি নিজের বিয়েটাও । কিন্তু মার প্রতি এই অতিরিক্ত
ভালবাসাই তার কাল হয়ে গেল ।
- কিভাবে ?
- সেটাই তো বলছি , দুমাস আগে কালীপূজোর দিন সদানন্দের মা মারা যায় –
- ম-মানে-
- বলছি ধৈর্য্য ধরুন । মৃত্যুর পর লোকজনে ভরে যায় উঠোন । সদানন্দ কিন্তু কাঁদল না । ‘ আমার মা আমাবস্যায়
মরেছে। আমি মাকে বাঁচাব।‘ এইসব বিড়বিড় করে বলতে
লাগল । কেউ বিশ্বাস করেনি । কিন্তু সে মৃতদেহ ছাড়তে রাজী নয় । অনেক ঝামেলার পর ফিরে যায় যারা এসেছিল
। এরপর সদানন্দ রাতে কি তন্ত্রসাধনা
করেছিল জানি না তবে মার প্রাণ ফিরে এসেছিল কিন্তু সে প্রাণ মানুষ না পশুর না শয়তানের
তা কেউ জানে না ! সে অদ্ভুত আচরণ করে । কাউকেই সে চিনতে পারে না । মাঝে মাঝে হিংস্র হয়ে ওঠে । সারাদিন শুধু শুয়েই থাকে । সে এক অপদেবতা !
একবার
ঢোক গিলল অমিত । অন্যসময় হলে এগুলো শুনে হয়ত
হেসেই উড়িয়ে দিত । কিন্তু এই শীতভরা পাণ্ডববর্জিত
এলাকায় বেশ প্রাসঙ্গিক মনে হল ।
- আপনার ট্রেন আসার সময় হলে বাবু । আমি চললাম ।
ভদ্রলোক
দোকান বন্ধ করলেন । ট্রেন আসার সময় হল । অমিত মনে মনে খুব উৎসুক হয়ে উঠল । শেষ ট্রেন তো দু ঘণ্টা পর । তার আগে একবার ঘুরে আসা যায় তো ! যেমন ভাবনা তেমন
কাজ । কলেজ-জীবনে সে অনেক রাজনীতি
করেছে। এখনো তারমধ্যে অফুরন্ত এনার্জি
রয়েছে । আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে ব্যাগটা স্টেশন
মাস্টারের কাছে রাখল । এবার নিজে হাটা শুরু করে দিল জন-মানবহীন লাল
মাটির রাস্তা দিয়ে । এর মধ্যেই কুয়াশা বেড়েছে । মুখ দিয়ে ধোঁয়া বার হচ্ছে । আকাশে তখনও
চাঁদের দেখা মেলেনি তবে লম্বা লম্বা তাল গাছের মাথা গুলো বেশ বোঝা যাচ্ছে ! ওই তো মাঠটা
! মাঠের শেষ প্রান্তে সমীরদের বাড়ি । রাস্তা থেকে নেমে মাঠ দিয়ে হাঁটা শুরু করল । প্রায়
হাফ মাইলের পথ । পাশের ঝোপঝাড় থেকে ক্রমাগত শেয়ালের আওয়াজ । যেন কোন অজানা আশঙ্কা থেকে
সাবধান করছে তাকে ।
কিছুক্ষণ
হাঁটার পর যখন সমীরদের বাড়ির কাছে এসে পৌঁছালো তখন যেন সে পাড়ায় ঘোর নিশুতি । সমীরদের
বাড়ি থেকে কোন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না । ওপরের ঘরে টিম টিম করে আলো জ্বলছে দেখা যাচ্ছে
জানালায় ফাঁক দিয়ে । অমিত উঠানে চলে এলো । চারজন বাড়িতে থাকে
অথচ টুঁ শব্দ টুকুও নেই ? কি করবে সে ? ভাবল ওপরে যাবে । সিঁড়ির ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে
দরজায় টোকা মারতে যাবে এমন সময় পাশের ঘর থেকে খচখচ করে আওয়াজ শুনতে পেল অমিত । ঠাকমার
ঘরটা না ? হ্যাঁ ওই ঘর থেকেই তো আসছে । দরজার কাছে গেল সে । মোবাইলের আলোটা জ্বাললো
। দরজাটা আস্তে আস্তে ফাঁক করে বিছানার দিকে আলো ফেলতেই যে ভয়ংকর দৃশ্য তার চোখে পড়ল
তাতে তার শরীর হিম হয়ে গেল । যে কোন মানুষের কাছে এ দৃশ্য সহ্য করা কঠিন । সে দেখল,
বিছানাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে আর তার ওপর সেই ছাগলটার মাথা ছাড়া শরীর । ঠাকমা ছাগলের
মাথাটা কামড়ে খাচ্ছে ! কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে গগন-ভেদী চিৎকার
করে উঠল অমিত । সঙ্গে সঙ্গে লাল চোখ আর রক্তমাখা মুখ নিয়ে তার দিকে তাকালো সে । একি
ভয়ংকর মুখ ! একটা হাত বাঁধা ছিল সেটা ছাড়িয়ে অমিতের দিকে আক্রমণ করার চেষ্টা করতে লাগল
! ইতিমধ্যে সমীর শুনতে পেয়েছে । দোতলা থেকে সে চিৎকার করতে লাগল,
ওরে অমিত তুই কেন ফিরে এলি ভাই ? পালা তুই । এ মানুষ খায় রে ! পালা পালা । অমিত
উঠানে চলে এলো । ঠাকমা হাতের দড়িটা ছিঁড়ে ফেলল । তারপর পশুর মত হামাগুড়ি দিয়ে
দ্রুত তার দিকে যেতে লাগল ।
আকাশে চাঁদ উঠেছে । দুর থেকে শোনা যাচ্ছে,
সদানন্দ চাটুজ্যের কান্না, ওরে আমার মা চলে গেল গো ! তোরা কেউ ধরে নিয়ে আয় । কুয়াশা ঘেরা মাঠ দিয়ে ঠাকুমা দৌড়চ্ছে হামাগুড়ি
দিয়ে । সামনে জোরে ছুটছে অমিত । লাস্ট ট্রেনটা ধরতেই হবে না হলে -

No comments:
Post a Comment