Thursday, 5 October 2017

সেই রাতটা! (পুরো গল্প) শোভন নস্কর

- হ্যালো? সমীর ? বল ভাই কেমন আছিস? ফোনেই পাওয়া যায় না তোকে !
- হ্যাঁ এখন একটু ব্যস্ত থাকি আজকাল । বাবা ব্যবসায় ঢুকিয়ে দিয়েছে ।
- ভালো তো ! কামাই কর এবার দুহাত দিয়ে !
- আর কামাই ! নানা ঝামেলায় ব্যবসা লাটে উঠেছে । তোর খবর কি ?
- এই তো চলছে । নতুন চাকরী উপভোগ করছি । সেই কলেজের পর থেকে তোর সাথে আর দেখা হয়নি। সামনে বড়দিনের ছুটি। ভাবছি তোর ওখানে কদিন যাব । এই শহরের ক্যাঁচক্যাঁচানি থেকে কদিন একটু দূরে থাকতে চাই ।
- বাহ বেশ তো ! চলে আয় একদিন। সেই পাঁচবছর হল তোকে শেষবার দেখেছি । জমিয়ে  আড্ডা মারা যাবে !
- অবশ্যই মাই ফ্রেন্ড পরের সপ্তাহে তবে দেখা হচ্ছে !
- একদম! রাখছি এখন ভাল থাকিস বাই
-বাই !
ফোনটা কেটে দিল অমিত বহুদিন পর প্রিয় বন্ধুর সাথে দেখা হবে এই ভেবেই সে ভীষণ খুশি

              ঘোড়াডাঙা স্টেশনে যখন নামল তখন সকাল ৯টা ঠাণ্ডাটা বেশ ভালই পড়েছে একেবারে ফাঁকা জায়গায় স্টেশন তিন চারজনের বেশি কেউ নামল না এক পাশে চাষের জমি অন্যপাশে মাঠ, গাছের সারির পাশ রাস্তা বলতে গেলে চোখ জুড়ানো পরিবেশ স্টেশন থেকে নামতেই সমীরের সাথে দেখা! ‘ কি ভাই কেমন আছিস’ বলে জড়িয়ে ধরল । আগের থেকে দুজনেই একটু মোটা হয়েছে। দুই বন্ধুর আবেগময় ভাব বিনিময়ের পর সমীর দূরে দাঁড়ানো ভ্যানটাকে দেখিয়ে বলল, চল যাওয়া যাক !

       দুপাশের বড় বড় বট আর আমগাছে ভর্তি রাস্তা দিয়ে যেতে লাগল তারা। পাশের মাঠটিও বেশ বড় হাফ মাইল তো হবেই । অমিত কলেজে পড়ার সময় একবার এসেছিল তেমনই আছে সব । পাল্টেছে যেটা তাহলো সমীরের পাড়ার লোকসংখ্যা । আগে বেশ জমজমাট পাড়া ছিল । এখন সর্বসাকুল্যে গোটা ছয় সাত বাড়ি রয়েছে । সবই ছোট ছোট সরকার থেকে দেওয়া পাকা বাড়ি । সমীরদের বাড়িটা বেশ পুরনো এবং বড় । প্রায় ৭০ বছর পুরনো তো হবেই ।  পাড়ার এই হাল কেন জিজ্ঞেস করতে সে বলল, ‘আরে গ্রামে থেকে কি করবে ! এখানে তো আর তেমন সুবিধা নেই। একটু লেখাপড়া শিখেই শহরে কাজ জুটিয়ে নিচ্ছে । পড়ে এসে বাবা মা কেও নিয়ে যায় আর ঘরগুলো তালা পড়ে থাকে। বাবার ব্যবসাটা এখনো চলছে বলে আমার এখানে থাকা।‘ উঠানে ছাগল দেখে অমিত একচোট হেসেই নীল ! একি রে! তোরা কি এখন ছাগল পুষছিস ?    সমীর একটু মুচকি হেসে বলল, হ্যাঁ ভাই !
        দুপুরে খাসির মাংস আর ভেটকি মাছের তরকারি খেয়ে দুই বন্ধু সুখের ঢেকুর তুলতে তুলতে পুকুর পাড়ে গিয়ে বসল । ইতিমধ্যে মাসিমার যত্ন আত্তির ঠেলায় অমিত অস্থির হয়ে উঠেছে । আসা থেকেই শুধু খাওয়া !
-বুঝলি সমীর, এবার থেকে এখানে এলে আগের দুদিন উপোষ করে আসবো , বুঝলি?
- তোদের বাড়িতে গেলেও তো ছাড়িস না
ক্রমশ আড্ডা চলতে লাগল কলেজের কত পুরনো কথা ইতিমধ্যে কয়েকজন এসে পুকুর থেকে স্নান করে গিয়েছে তারা অমিত কে দেখে যেন একটু অবাক হল মনে হল তাদের মনে বুঝি কিছু একটা আছে কয়েকজন যেন একটু ভীত শীতের দুপুর কখন যে বিকাল হয়ে যায় তার ঠিক নেইআর বিকাল হলেই তো সন্ধ্যে সাড়ে তিনটে বাজতেই সমীর হঠাৎ বলে উঠল, তোর কটায় ট্রেন ?      অমিত একটু আশ্চর্য হয়ে গেল ! সে তো আজ ফিরবে বলে আসেনি । সমীর কি সেটা বোঝেনি ?  কিন্তু এমন কেউ বললে তো কিছু করার নেই । জোর করে থাকা যায় না । বলল ,এই তো সাড়ে ছটার দিক ।

     আরো কিছুক্ষণ গল্প করার পর সমীর হঠাৎ বলে উঠল চল ভাই যাওয়ার আগে আমার ঠাকমার সাথে দেখা করিয়ে দেই । ঠাকমার কথা ভুলেই গিয়েছিল এতক্ষণ অমিত । আগের বার যখন এসেছিল তখন খুব যত্ন করেছিল । দাদুভাই বলে ডাকতেন ।  ‘হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই চল !’ বলে দুজনেই বাড়ির দিকে গেল । সমীরদের বাড়িটা ছিল দুতলা নিচের তলায় দুটো ঘর ওপরের তলায় দুটো ।তারা  ওপরেই থাকে বলে সোজাসুজি ওপরে গিয়েছিল । এখন নিচের তলায় ঠাকমার ঘরের দরজাটা খুলে দিল সমীর । ঠাকুমাকে দেখে কষ্ট হল অমিতের । বিছানার এক কোণে শুয়ে রয়েছেন । শীর্ণ শরীর । মনে হয় বিছানার সাথে মিশে গেছেন ।  ‘ও ঠাকমা, চিনতে পারছ ? অমিত এসেছে। ওকে মনে আছে ?’ চেঁচিয়ে বলল সমীর ।  ঠাকমা কোন উত্তর দিল না । শুধু একবার তাকালো । চোখ গুলো কোটরে ঢুকে গেছে । মনে হয় চিনতে পারেনি ! অমিতের মনটা বড্ড খারাপ হয়ে গেল ! কি প্রাণচঞ্চল ছিলেন আর এখন কি অবস্থা ! হাতে দড়ি বাধার দাগও দেখা গেল ।  সমীর বলল, ক্যান্সারে ভুগে ভুগে এই অবস্থা !এখন মৃত্যুর অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু পথ নেই। মাঝে মাঝে জ্বালাতন করলে দড়ি বেঁধে খাওয়াতে হয় !

 - ঠিক আছে বাবা আবার এসো কিন্তু !   এইবলে হাসি মুখে বিদায় জানালেন সমীরের মা ।ভ্যানে করে এসে সন্ধ্যার আগে স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে চলে যায় সমীর । ট্রেন আসতে এখনো আধঘণ্টা একটা চায়ের দোকানে বসল অমিত । চা খেয়ে পকেট থেকে সিগারেটটা বার করে টানতে লাগল । বেশ ঠাণ্ডা তো পড়েইছে তারওপর মনুষ্যহীন এলাকা । ঠাণ্ডা কাঁপুনি ধরিয়ে দেয় । কলকাতায় এসব বোঝাই যায় না । হারিকেনের আলোর সামনে বসে অনেক কথা মনে পড়ছিল অমিতের । সমীরের কতটা পরিবর্তন হয়ে গেছে! নিজের বন্ধুকেও সে বের করে দিতে পারলে খুশি হয় । এমনকি ট্রেন আসা অবধিও অপেক্ষা করল না সে অথচ শেষবার যখন এসেছিল –
- আর এক কাপ চা দেব বাবু?                 আচমকা ধীর কণ্ঠে বলে উঠলেন বৃদ্ধ দোকানদার  
- -না থাক
- তাহলে বাবু উঠবেন ? আমি দোকান বন্ধ করব এইবার
-এত জলদি ?
- কার জন্য খুলে রাখব বলুন? দেখছেন তো এতবড় স্টেশনে আমি আপনি আর স্টেশন মাস্টার ছাড়া কেউ নেই !
- তা বটে !               বলে দামটা চুকিয়ে বেরোতে যাবে এমনসময় বৃদ্ধ বললেন , আপনি সদানন্দ চাটুজ্যের বাড়িতে উঠেছিলেন না ?
-হ্যাঁ , কেন ?
-ওইজন্য ! আপনাকে সন্ধ্যার আগেই পার করে দিয়েছে
-ব্যাপারটা কি একটু খুলে বলবেন ?
ভদ্রলোক হেসে বললেন ,আপনার ট্রেন টাইম হয়ে গেছে বাবু
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অমিত বলল, এখনো পনেরো মিনিট আপনি বলুন
বৃদ্ধ বেঞ্চিতে বসে একটা বিড়ি ধরালেন তারপর বলা শুরু করলেন , সদানন্দ মানে আপনার বন্ধু সমীরের বাবা এলাকায় বেশ সম্মানীয় ভাল ব্যবসা আছে বাজারে সন্তান বৌ আর মাকে নিয়ে বেশ সুখী পরিবার ছিল কিন্তু আসল ঘটনার শুরু বহু আগে স্কুলে পড়ার সময় কোন তান্ত্রিকের পাল্লায় পড়ে সে চলে যায় আবার দু বছর পরে ফিরে আসে লোকে বলে সে নাকি বাবা মার মায়া ত্যাগ করতে পারেনি এসে দেখে বাবা মৃত ব্যবসা কোনরকমে চলছে তখন ব্যবসার দায়িত্ব নিয়ে আবার দাঁড় করালেন কিন্তু বাবা মায়ের এই পরিণতির জন্য নিজে অপরাধ বোধে ভোগেন এরপর থেকে মা কে কখনও চোখের আড়াল করেননি মা যা যা চেয়েছেন বা বলেছেন সব করে গেছেন এমনকি নিজের বিয়েটাও কিন্তু মার প্রতি এই অতিরিক্ত  ভালবাসাই তার কাল হয়ে গেল 
- কিভাবে ?
- সেটাই তো বলছিদুমাস আগে কালীপূজোর দিন সদানন্দের মা মারা যায়
- -মানে-
- বলছি ধৈর্য্য ধরুন মৃত্যুর পর লোকজনে ভরে যায় উঠোন সদানন্দ কিন্তু কাঁদল না আমার মা আমাবস্যায় মরেছে আমি মাকে বাঁচাবএইসব বিড়বিড় করে বলতে লাগল কেউ বিশ্বাস করেনি কিন্তু সে মৃতদেহ ছাড়তে রাজী নয় অনেক ঝামেলার পর ফিরে যায় যারা এসেছিল এরপর সদানন্দ রাতে কি তন্ত্রসাধনা করেছিল জানি না তবে মার প্রাণ ফিরে এসেছিল কিন্তু সে প্রাণ মানুষ না পশুর না শয়তানের তা কেউ জানে না ! সে অদ্ভুত আচরণ করে কাউকেই সে চিনতে পারে না মাঝে মাঝে হিংস্র হয়ে ওঠে সারাদিন শুধু শুয়েই থাকে সে এক অপদেবতা !
একবার ঢোক গিলল অমিত অন্যসময় হলে এগুলো শুনে হয়ত হেসেই উড়িয়ে দিত কিন্তু এই শীতভরা পাণ্ডববর্জিত এলাকায় বেশ প্রাসঙ্গিক মনে হল
- আপনার ট্রেন আসার সময় হলে বাবু আমি চললাম
ভদ্রলোক দোকান বন্ধ করলেন ট্রেন আসার সময় হল অমিত মনে মনে খুব উৎসুক হয়ে উঠল শেষ ট্রেন তো দু ঘণ্টা পর তার আগে একবার ঘুরে আসা যায় তো ! যেমন ভাবনা তেমন কাজ কলেজ-জীবনে সে অনেক রাজনীতি করেছে এখনো তারমধ্যে অফুরন্ত এনার্জি রয়েছে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে ব্যাগটা স্টেশন মাস্টারের কাছে রাখল । এবার নিজে হাটা শুরু করে দিল জন-মানবহীন লাল মাটির রাস্তা দিয়ে । এর মধ্যেই কুয়াশা বেড়েছে । মুখ দিয়ে ধোঁয়া বার হচ্ছে । আকাশে তখনও চাঁদের দেখা মেলেনি তবে লম্বা লম্বা তাল গাছের মাথা গুলো বেশ বোঝা যাচ্ছে ! ওই তো মাঠটা ! মাঠের শেষ প্রান্তে সমীরদের বাড়ি । রাস্তা থেকে নেমে মাঠ দিয়ে হাঁটা শুরু করল । প্রায় হাফ মাইলের পথ । পাশের ঝোপঝাড় থেকে ক্রমাগত শেয়ালের আওয়াজ । যেন কোন অজানা আশঙ্কা থেকে সাবধান করছে তাকে ।

   কিছুক্ষণ হাঁটার পর যখন সমীরদের বাড়ির কাছে এসে পৌঁছালো তখন যেন সে পাড়ায় ঘোর নিশুতি । সমীরদের বাড়ি থেকে কোন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না । ওপরের ঘরে টিম টিম করে আলো জ্বলছে দেখা যাচ্ছে জানালায় ফাঁক দিয়ে । অমিত উঠানে চলে এলো । চারজন বাড়িতে থাকে অথচ টুঁ শব্দ টুকুও নেই ? কি করবে সে ? ভাবল ওপরে যাবে । সিঁড়ির ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে দরজায় টোকা মারতে যাবে এমন সময় পাশের ঘর থেকে খচখচ করে আওয়াজ শুনতে পেল অমিত । ঠাকমার ঘরটা না ? হ্যাঁ ওই ঘর থেকেই তো আসছে । দরজার কাছে গেল সে । মোবাইলের আলোটা জ্বাললো । দরজাটা আস্তে আস্তে ফাঁক করে বিছানার দিকে আলো ফেলতেই যে ভয়ংকর দৃশ্য তার চোখে পড়ল তাতে তার শরীর হিম হয়ে গেল । যে কোন মানুষের কাছে এ দৃশ্য সহ্য করা কঠিন । সে দেখল, বিছানাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে আর তার ওপর সেই ছাগলটার মাথা ছাড়া শরীর । ঠাকমা ছাগলের মাথাটা কামড়ে খাচ্ছে ! কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে গগন-ভেদী চিৎকার করে উঠল অমিত । সঙ্গে সঙ্গে লাল চোখ আর রক্তমাখা মুখ নিয়ে তার দিকে তাকালো সে । একি ভয়ংকর মুখ ! একটা হাত বাঁধা ছিল সেটা ছাড়িয়ে অমিতের দিকে আক্রমণ করার চেষ্টা করতে লাগল ! ইতিমধ্যে সমীর শুনতে পেয়েছে । দোতলা থেকে সে চিৎকার করতে লাগল, ওরে অমিত তুই কেন ফিরে এলি ভাই ? পালা তুই । এ মানুষ খায় রে ! পালা পালা । অমিত উঠানে চলে এলো । ঠাকমা হাতের দড়িটা ছিঁড়ে ফেলল । তারপর পশুর মত হামাগুড়ি দিয়ে দ্রুত তার দিকে যেতে লাগল ।
      
     আকাশে চাঁদ উঠেছে । দুর থেকে শোনা যাচ্ছে, সদানন্দ চাটুজ্যের কান্না, ওরে আমার মা চলে গেল গো ! তোরা কেউ ধরে নিয়ে আয় ।  কুয়াশা ঘেরা মাঠ দিয়ে ঠাকুমা দৌড়চ্ছে হামাগুড়ি দিয়ে । সামনে জোরে ছুটছে অমিত । লাস্ট ট্রেনটা ধরতেই হবে না হলে -



No comments:

Post a Comment

সেরা পোস্ট

সেই রাতটা! (পুরো গল্প) শোভন নস্কর

- হ্যালো? সমীর ? বল ভাই কেমন আছিস? ফোনেই পাওয়া যায় না তোকে ! - হ্যাঁ এখন একটু ব্যস্ত থাকি আজকাল । বাবা ব্যবসায় ঢুকিয়ে দিয়েছে । - ভালো ...