আজ আনন্দবাজারে মছলন্দপুরের একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট লেখা হয়েছে যেটা দেখতে নাকি প্রচুর লোক এসেছিল। মফস্বল বা গ্রাম গুলিতে এখনো এই টুর্নামেন্ট গুলো হয়। কিন্তু খুব কমে গেছে। এখনো মাঠে লোক হয় কিন্তু খেলোয়াড় কই?
সেই টেনিদা থেকে ধন্যি মেয়ে, বাঙালির গালি ফুটবল নিয়ে কত লেখালেখি বা সিনেমা হয়েছে তার ঠিক নেই। সেই যুগে মোবাইল এন্টারটেইনমেন্ট ছিল না মানুষের। ছিল পাড়ার ম্যাচ। সেটা দেখার সুযোগ আমার একটু হলেও হয়েছিল। খুব ছোট ছিলাম। বাবা তখন ক্লাবের সেক্রেটারি। চুটিয়ে ক্লাব করত। বাসন্তী পুজোর দিকে এদিকের একটা মাঠে খেলা হত। সে কি তোর জোড় রে বাবা! বাড়ির বৌ রা সকাল থেকে রুটি তরকারি করত প্লেয়ারদের টিফিনের জন্য। বাবা কিনে নিয়ে আসত পাউরুটি কলা এইসব। লোভী দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতুম। পাড়ার প্লেয়ার খুব বেশি ছিল না। কিন্তু বাবা সংগ্রামপুর ও অন্যান্য প্রত্যন্ত এলাকা থেকে প্লেয়ার ভাড়া করে আনত। সারাদিনে ৫০ টাকা। বেশিরভাগ ছেলেই ছিল গরীব আর মুসলমান। জান লড়িয়ে খেলে দিত। একটু বড় প্লেয়ারের দেমাগ হত বেশি। তাই ক্লাবের ছেলেরা তাদের আনতো না।
ম্যাচের দিন মাঠের ধারে রীতিমত মেলা বসে যেত। বাবা গণ্যমান্য লোক ছিলেন বলে আলাদা চেয়ারে বসতেন বড় দের সাথে। পাড়ার জুনিয়ররা বাবার সামনে খিস্তি মারত না, সিগারেটও খেত না। তারা একটু দূরে গিয়ে চিল চিৎকার করত। মার মার , ল্যাং দে, পাটাই ফ্যাল, দে দৌড়, মার একখান ঘুষি এইসব আওয়াজ শুনে যে কেউ মনে করতে পারে এখানে হয়ত বক্সিং চলছে। এইসব ম্যাচে রেফারিগিরি স্বয়ং ফিফার সেরা রেফারির পক্ষে সম্ভব না। সকাল থেকে সন্ধে রেফারি দর্শকদের খিস্তি শুনেই যেত। ফাউল বা পেনাল্টি খুব কম দেওয়া হত। রেফারির কাজ ছিল মাঠে মারপিট সামলানো !
সারাদিন পর যখন কাপ জেতা হল পাড়ার ছেলেরা ডাক ঢোল বাজিয়ে মাইক বাজিয়ে মাথায় শিল্ড নিয়ে আসত। কারোর কাঁধে দেখতাম খেপ খেলা কোন প্লেয়ার। জিতলেই বাবা এক্সট্রা টাকা দিতেন খুশি হয়ে । বাবার তখন অফিস ছিল গ্রামের দিক তাই তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। সে প্রায় ৯৩-৯৪ সালের কথা। তখন কারেন্ট ছিল না আমাদের পাড়ায়। ব্যাটারি দিয়ে সারারাত মাইক বাজানো হত আনন্দে। ৯৪ তে বিশ্বকাপ দেখার জন্য বাবা কিনল সাদাকালো ছোট টিভি। চালানো হত ব্যাটারিতে। ৯৬ তে এক কাকা মারা যাওয়ার পর বাবা আর ক্লাব মুখো হয়নি। কালের নিয়মে সে খেলাও থেমে যায়।
৯০ আর দশকের সাথে এখনকার ফারাক অনেক। যেটা আগে কোন দশকের সাথে হয়নি। তার অন্যতম কারণ প্রযুক্তির উন্নতি আর বিশ্বায়ন। মাঠে খেলা বন্ধ হওয়ার জন্য প্রযুক্তিকে আমরা গালাগাল দেই বটে কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি যে বাচ্চাদের জন্য আমরা কতটুকু মাঠ দিয়েছি?

No comments:
Post a Comment