Saturday, 30 September 2017

রাখিবন্ধন -মনোতোষ বিশ্বাস


সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাবার পুরোনো দম দেওয়া ঘড়িটায় সময় দেখে নেয় পল্টু।
"ইশ, ছটা বেজে গেল!"-বলেই তাড়াহুড়ো করে উঠে বসে বিছানায়।পাশে এখনো ঘুমে অচেতন তার পাঁচ বছর বয়সের বোন টিয়া।তাকে না ডেকেই বিছানা ছেড়ে নেমে পড়ে পল্টু।
পল্টু চার বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছে। তখন বোনের বয়স মাত্র তিন মাস। মাও নেই বছর দুই হলো। পল্টুর স্মৃতিপটে বাবা মায়ের স্মৃতি কিছুটা থাকলেও টিয়ার বাবার কথা কিছুই মনে নেই। মায়ের কথাও একটু আধটু মনে পড়ে টিয়ার।এখন পিতৃমাতৃহীন ভাইবোন অযত্নে মানুষ হচ্ছে মামা মামীর কাছে। পরিবর্তে অবশ্য সংসারের অনেক কাজই করতে হয় দুজনকেই।বাড়তি পাওনা মামীর মুখের অকথ্য গালিগালাজ। মামাও মামীর ভয়ে কাঠ হয়ে নীরবে দেখে চলেন সবকিছু।
আজ রাখিবন্ধন।তাই পল্টু অনেকদিন ধরেই বাজার খরচের টাকা থেকে একটু একটু করে খুচরো জমিয়ে সাত টাকা জমিয়েছিল। কিন্তু বোনকে মাত্র এই কটা টাকাই কি বা কিনে দেবে সে! তাই কাজলকাকুকে বলে কিছু কমদামি রাখি বাকিতে আনিয়ে রেখেছিল বিক্রি করবে বলে। সেগুলো নিয়ে মামা মামীর অলক্ষ্যে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে পল্টু। সাতটা টাকা মনে করে প্যান্টের পকেটে নিয়েই বেরিয়েছে সে।
"দিদি রাখি নেবে?"-এক পথচলতি কলেজছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করে পল্টু।
"কত করে?"-শোনে মেয়েটি।
"এক টাকা করে দিদি"-বলে সে।
"দুটো দাও।"
ছোট্ট পল্টুর কাছ থেকে হয়তো বা এমনিই দুটো রাখি কিনে নেয় মেয়েটি।
পল্টু এগিয়ে চলে বড় রাস্তার দিকে।আরো কিছু রাখি বিক্রি করে সে।আর মাত্র কয়েকটা রাখিই আছে তার কাছে। আরো দুটো রাখি বিক্রি হয়।রাস্তার পাশের পরোটার দোকানের ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে নেয় পল্টু। ঘড়িতে তখন পৌনে সাতটা।আর দেরী করা যাবেনা। মামী ঘুম থেকে ওঠার আগেই বাসনগুলো মেজে দিতে হবে প্রতিদিনের মতন। নইলে আর রক্ষে থাকবেনা। হাঁটতে হাঁটতেই গুনে নেয় কটা রাখি বাকি আছে। আর মাত্র পাঁচটা। এগিয়ে যায় পল্টু।এক ভদ্রলোক ডাকে পল্টুকে।
"এই ছোঁড়া। কত করে তোর রাখি?"-প্রশ্ন করেন তিনি।
"এক টাকা করে বাবু।"
"পাঁচটা দে। চার টাকা নিস ক্ষণ"- বলেন ভদ্রলোক।
হাতে আর সময় নেই বেশি। আর সময় নষ্ট না করে রাখিগুলো দিয়ে দেয় পল্টু।
"এই নে পাঁচ টাকা।এক টাকা ফেরত দে।"
টাকা ফেরত দিয়ে দ্রুত হাঁটা শুরু করে পল্টু। কাজল কাকুর বাড়ির সামনে গিয়ে পকেট থেকে খুচরো পয়সা গুলো বের করে সে।গুনে নেয় একবার।মাত্র চব্বিশ টাকা। এই টাকাগুলো কাজলকাকুকে দিলে লাভের তিন চার টাকা হয়তো পাবে সে। টাকাগুলো কাজলবাবুকে দিতে যায় পল্টু।
"ওগুলো তুই রেখে দে পল্টু।বোনের জন্য কিছু একটা কিনে নিস।আর দেরি করিস না,যা"-বলেন কাজলবাবু।
পল্টুর চোখে তখন উঁকি দিচ্ছে আনন্দাশ্রু; খেয়াল করে ওর মাথায় হাত রাখেন কাজল বাবু। আনন্দে আত্মহারা পল্টু দৌড় দেয় রাস্তার মোড়ের বড়ো দোকানটার দিকে।বোন অনেকদিন ওই দোকানের সামনের দিকে রাখা নীল কাগজে মোড়া চকোলেট খেতে চেয়েছে ওর কাছে। পকেট থেকে ওই চব্বিশ টাকা আর আগের জমানো সাত টাকা একসাথে নেয় পল্টু।
"কাকু ওই চকোলেট তা কত দাম গো?"-শোনে পল্টু।
"বড়োটা সত্তর টাকা ।"
মন টা খারাপ হয়ে যায় পল্টুর।
"আর ওই টা?"-জিজ্ঞাসা করে সে।
"ওটা পঞ্চাশ।"-বলেন দোকানদার।
"আর ওই ছোটটা?"
"ওটা ত্রিশ।"
পয়সা গুলো একটা একটা করে গোনে পল্টু। একত্রিশ! আনন্দে ভরে ওঠে মনটা।
"ওই টা দিন কাকু।ওই ছোট টা।"-পয়সা গুলো মুঠোয় ভরে এগিয়ে দেয় দোকানদারের দিকে।
পকেটে চকোলেটটা ভরেই দৌড় দেয় বাড়ির দিকে। মনে মনে আজ ভীষণ খুশি পল্টু। এতদিনে বোনের একটা আবদার সে মেটাতে পারবে তাহলে! আলতো করে উঠোনের দরজা খোলে সে।
"না,এখনো মামী ওঠেনি তাহলে।যাক,বাঁচা গেল!"-ভেবে আশ্বস্ত হয় পল্টু। পা টিপে টিপে এগিয়ে যায় নিজের ঘরের দিকে।
কিন্তু টিয়া কোথায়! ঘরের মধ্যে তো ও নেই! দৌড়ে বেরিয়ে আসে পল্টু।চারপাশ খুঁজে কোথায় পায়না বোনকে। চিন্তায় ঘেমে ওঠে পল্টু। কোথাও না পেয়ে ঘরে এসে ধপ করে বসে পড়ে বিছানায়।
কিছুক্ষনের মধ্যে দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে টিয়া। তার হাতে সুতো দিয়ে নয়নতারা ফুলে গাঁথা একটা রাখি। নিজে হাতে বানানো।
" হাতটা দে দাদা।রাখি পড়াবো" - আদো আদো ভাষায় বলে টিয়া।
" তুই এটা নিজে বানিয়েছিস?"-শোনে পল্টু।
"হুম।"-জবাব দেয় টিয়া।
খুশিতে হয়ে হাত বাড়িয়ে দেয় পল্টু।সযত্নে রাখি বেঁধে দেয় ছোট্ট বোন তার দাদার হাতে।এরপর টিয়াকে চোখ বন্ধ করতে বলে পল্টু।পকেট থেকে লুকিয়ে চকোলেট বের করে বোনকে দেয়। চোখ খুলে আনন্দে লাফিয়ে উঠে টিয়া। তারপর জড়িয়ে ধরে দাদাকে। পল্টুর গাল বেয়ে তখন গড়িয়ে পড়ছে দুফোটা চোখের জল---আনমনে।

প্রতীক্ষা -- মনোতোষ বিশ্বাস


স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে সরীসৃপ খেলা করে,
দেওয়ালের আনাচে কানাচে টিকটিকির আনাগোনা।
নিবিড় অন্ধকার গ্রাস করে চেনা শরীর;
কখনো অচেনার আগমনের বিভীষিকা।
ফুটো ছাদ অনুমতি দেয়-
কখনো একফালি রোদ, কখনো
চুঁইয়ে পরে ফোটা ফোটা বৃষ্টি।
চিলেকোঠা থেকে উঁকি মেরে যায় ভীত টুনটুনিটা।

মশা মাছগুলো চেটেপুটে উপভোগ করে নগ্ন শরীর;
তথাকথিত সভ্যসমাজ আখ্যা দেয় পতিতা।
মনের গভীরে ঘন কালো মেঘ,
তবু বৃষ্টি আসেনা মরুভূমি চোখে।
নিঃসঙ্গ মন,যদিও আসে যায় শরীর সর্বস্ব সঙ্গীরা;
শয্যা সঙ্গীর অভাব নেই,অভাব একজন মনের মানুষের।
চারিদিক অন্ধকার, ফিকে হয় অপেক্ষার আলো;
তবু ক্লান্ত অবসন্ন মন বেঁচে থাকে---
আশার বিবর্ণ ফ্যাকাশে আলোয়।
এরই মধ্যে কানে বাজে কড়ার আওয়াজ--
উৎসুক মনে স্বপ্ন বাঁধে বাসা।
কিন্তু দরজা খুলতেই গ্রাস করে একরাশ হতাশা;
আরো একবার সর্বস্ব লুটে নেই সভ্যসমাজ।
তখনো আবেগহীন শরীর মন মগ্ন কারো আসার অপেক্ষায়
কে জানে হয়তো একটা ছোট্ট সুখী ঘর তার প্রতীক্ষায়।।

Friday, 29 September 2017

ক্যুইজ টাইম ১ -শোভন নস্কর

 

১। চওড়ায় ১০ ফুট, লম্বায় পুরোনো মাপের একক এক চেইনের সমান। এর মাপ ঠিক হয় ১৭৪৪ সালে। আজও অপরিবর্তিত । যদিও এর সঙ্গে যুক্ত অনেক কিছুর মানের পরিবর্তন হয়েছে । কিসের কথা বলছি?

২। ১৯৩৫ সালে মিসিসিপির টুপলো শহরে জন্ম। আমার নামের মাঝে অ্যারন আছে । আমি কে ?

৩। ১৯৬৯ সালে এল সাল্ভাদর আর হন্ডুরাসের মধ্যে একটা ম্যাচ হয় । কেন ইতিহাসে ম্যাচটার নাম রয়েছে?

৪। night of the living dead, dawn of d dead, resident evil, 28 days later, I am legend…………. মিল কি?

৫। আমি একজন সাই ফাই লেখক । রাজনীতি ইতিহাস যুদ্ধের নিয়ম নিয়েও বই লিখেছি। স্টার ট্রেকের এপিসোড গুলি আমার ছোট গল্প থেকে নেওয়া। আমি কে?

৬। ‘you must have chaos within you to give birth to a dancing star’   - friednich nietzche 
কোন বলিউড সিনেমার আগে এই উক্তিটি করা হয় ?

৭।৭.৮০দশকে একজন বিখ্যাত ইংরেজ লেখক ক্যারিবিয়ান দীপপুঞ্জে বেড়াতে যান । সেখানে হোটেলের নেম লিস্টে এক পক্ষ্মী বিশারদের নাম দেখে পছন্দ হয় । তিনি পরে নামটা নিজের ফিকশন চরিত্রে দেন । পরে চরিত্রটি হিট হয় । লেখক কে?

উঃ ১।ক্রিকেট পিচ
২।এলভিস প্রেসলে
৩। ফুটবল ওয়ার
৪। জোম্বি মুভি
৫। হোবার্ট জর্জ ওয়েলস


৬। ডার্টি পিকচার
৭। ইয়ান ফ্লেমিং

Thursday, 28 September 2017

গরুচোরের সন্ধানে শেষ পর্ব- শোভন নস্কর


-স্যর, ঝাউডাঙায় আবার-

-বলিস কি? কনস্টেবল দুটো করছিল কি? ডেকে আন তো ব্যাটা দুটো কে!
             দুজন   ঘরে এসে মুখ কাঁচুমাচু করে বসে থাকলবকাঝকা দিয়ে কোন লাভ হল না! বলল, ওরা নাকি ঘুমিয়ে পড়েছিল, সেই ফাঁকেই-
সবকটা ফাঁকিবাজ এদের দিয়ে কিস্যু হবে না।যা করতে হবে এবার নিজেকেই করতে হবে।
      সুতরাং সদানন্দকে নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম । পুজোর সময় কিন্তু কাল থেকে বৃষ্টি নেমেছে। বিরক্তিকর। ঘন কালো মেঘে আকাশ ভর্তি। রাস্তায় গাড়ি মাঝে মাঝেই জল কাদায় পড়ছে।পথে যেতে বিএসএফ ক্যাম্পটাও দেখি কেমন যেন থমথমে ভাব ।চারিপাশে আর সবুজের সমারোহ নেই ।বিশাল গাছ গুলোকে  মনে হচ্ছিল পাহাড়ের মতন, বর্ষার অস্পষ্ট পরিবেশের মধ্যে দিয়ে যেন কোন পাতালপুরীতে চলেছি।
      গ্রামে যখন পৌঁছলাম তখন আমাদের গাড়িটা দেখে হইচই শুরু হয়ে গেছে।কয়েকটা অর্ধনগ্ন বাচ্চা ছুটে আসলো গাড়ির পিছন পিছন। সব কর্দমাক্ত।আশেপাশে যারা ছিল তাদের দেখে মনে হল না তারা আমাদের ওপর খুব প্রসন্ন হয়েছে।নরহরিকে জিজ্ঞেস করলাম পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ি কথায়?  নরহরি আঙুল দেখিয়ে নির্দেশ করল ।
     সে রাস্তায় গাড়ি নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। আমি আর সদানন্দ ছাতা মাথায় দিয়ে কাদার উপর দিয়ে যেতে লাগলাম। সরু রাস্তা । বাড়ির আশেপাশে লম্বা লম্বা তাল আর নারকেল গাছে ভর্তি । দুতলা বাড়ি নয় কিন্তু গ্রামের হিসাবে বড় বাড়িই বলতে হবে। আমাদের দেখেই হারিকেন হাতে এগিয়ে এলেন রতনবাবু। গ্রামে বিদ্যুৎ থাকলেও বৃষ্টি হলেই লোডশেডিং।
-আরে স্যর। কি সৌভাগ্য আসুন আসুন।    বলে দন্ত বিকশিত করে বসতে বললেন। ভুঁড়িওয়ালা মোটা গোঁফ, বয়স পঞ্চাশ লোক হবে। বাইরে তখন বৃষ্টি বেড়েছে। সন্ধ্যা হব হব ভাব। ছাতা বন্ধ করে চেয়ারে বসলাম। টেবিলে হারিকেনটা জ্বলছে। সদানন্দ পাশে দাড়িয়ে।
-কি ব্যাপার? আপনার এলাকায় বার বার গরু চুরি হচ্ছে। আপনার যে কোন হেলদোল নেই মশাই!
ভুরু কুঁচকে রতন বিশ্বাস বলল, কি বলছেন স্যর! আমি ভীষণ চিন্তিত-
-আপনার তো দেখে তা মনে হয় না মশাই।আমদের সাথে যা যোগাযোগ করার সব তো ঐ নরহরি-
-আরে রাখুন ত!নরহরির একটু বেশি চিন্তা! গ্রামে অমন দু একটা চুরিচামারি হয়। আরে বর্ডার এলাকা বলে কথা !
-তাই কি!
ইতিমধ্যে কোত্থেকে চা আর সিঙ্গারা নিয়ে হাজির রতনবাবুর স্ত্রী । দুজনে লোভ সামলাতে না পেরে কামড় বসালাম।রতন বাবু হেসে বললেন , খান স্যর। লাগলে বলবেন ।
চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, রতনবাবু ওই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পিচের রাস্তাটা করলেন কেন?
যেন কিছুই বোঝেননা এমন ভাবে উত্তর দিলেন , আরে স্যর গ্রামের বাচ্চারা স্কুল যায় ওই রাস্তা দিয়ে কত সুবিধা হল বলুন তো।
-গ্রামের ভিতরের রাস্তা কাঁচা । এই বর্ষায় কাদায় ভর্তি আর আপনি স্কুল দেখাচ্ছেন।
-স্যর গ্রামেও হয়ে যাবে , পরের বছর টাকাটা হাতে পেলে-
-থামুন । কিছু বুঝিনা ভাবছেন?লজ্জা হওয়া উচিৎ আপনার।যারা আপনাকে ভোট দিয়ে জিতিয়েছে তাদের এভাবে সব্বনাশ করছেন। বলি , কতটাকা পান?
-মা-মানে?
-মানে কিছুনা একদিন রাতে তুলে নিয়ে গিয়ে লকআপে এমন মার দেব সারাজীবন মনে রাখবেন। আপনার কোনো পার্টির নেতা অবধি টু শব্দ পাবে না।সকালবেলায় ঠিক টাইমে বাড়ি পৌঁছে দেব । যাবেন নাকি?
লোকটা ইতস্তত করতে লাগল। কাঁদবেন না রাগবেন বুঝে উঠতে পারছেন না!
-না-না! আমি কিচ্ছু জানি না স্যর সত্যি বলছি ।
-নাহ আপনি সত্যিটা বলছেন না।আপনাকে তবে নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছি ।    বলে যেই হাতটা ধরলাম বেচারার অবস্থা কাঁদো কাঁদোহাত ছাড়িয়ে বলল, বলছি বলছি স্যর, কোথাও নিয়ে যাবেন না!
চেয়ারে আবার বসে সিগারেটটা ধরালাম ।রতন বাবুর মুখ নিচের দিকে।হারিকেনের আলোয় মুখের অর্ধেকটা দৃশ্যমান ।
-এবার ঝেড়ে কাশুন তো মশাই, অনেক হয়েছে ।
রতনবাবু বলা শুরু করলেন, আপনি তো নিশ্চয় জানেন পুরো বনগাঁ থেকে এতদূর পর্যন্ত চোরা ব্যবসায়ীদের একটা জাল বিছানো রয়েছে! চার পাঁচজন হল এর মাথা। মন্ত্রী থেকে শুরু করে পাড়ার গুণ্ডা অবধি সবই এদের হাতে রয়েছে।পঞ্চায়েত-প্রধান হয়ে জেতার সাথে সাথেই ওই জায়গায় রাস্তা তৈরির চাপ আসতে থাকে । টাকাও আসে । বিশ্বাস করুন আমি চাইনি এসব করতে কিন্তু দলের কথায় করতে বাধ্য । এদিকে ব্যবসা সামলায় বিশু মল্লিক । নাম শুনেছেন নিশ্চয় ।ভীষণ প্রতিপত্তি । তার গায়ে একটা আঁচড়ও লাগাতে পারবেন না। হাত দিয়েছেন তো মরেছেন। সবই তার হাতে ।কিন্তু অন্য ব্যবসায়ীদের তুলনায় এই লোক অত্যন্ত নিকৃষ্ট যাকে বলে ।বাইরে থেকে একবার গরু আনতে গিয়ে গাড়ি নাকি অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যায় । ড্রাইবার , দুই খালাসি আর গোটা দশেক গরু ব্রিজ ভেঙে সোজা জলে । ক্ষতিপূরণের জন্য ওই অসভ্য লোকটা গ্রামের লোকেদের গরু চুরি করা শুরু করেছে । কিন্তু চারটে গরুচুরির পর আর সে চুরি করেনি। সে আমাকে বলেছিল। কিন্তু তারপরও চুরি হচ্ছে। আমার সন্দেহ এগুলো ছিঁচকে চোরের কাজবিশুর দেখানো পথেই তারা সাহস পেয়ে গেছে ।

     সিগারেটটা শেষ করলাম!বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে । সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সদানন্দকে বললাম , টর্চটা এনেছিস রে?
-হ্যাঁ স্যর ।
-বউকে ফোন করে দে যে আজ রাত্রে আর বাড়ি ফিরছিস না।
-স্যর প্লিজ।কাল মেয়ের জন্মদিন। অনেক কাজ বাড়িতে-
-মেলা ফ্যাচ ফ্যাচ করিস নাতো! কি জন্য এই চাকরী করতে এসেছিলি?
সদানন্দ বকা শুনে চুপ মেরে গেল!

       রাত এগারোটায় জঙ্গলের মধ্যে জিপটায় বসলাম ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার । আকাশ পরিষ্কার হয়েছে। তবু চারিদিক ভেজা ভেজা। সোঁদা গন্ধ । চাঁদ তখনো ওঠেনি । জোনাকির আলো তখন সেই নিস্তব্ধ নরকের অন্ধকার ভাঙ্গার ব্যর্থ প্রয়াস করছে ।আজ রাতে কিছুই হয়ত হবে না তবে জেদ চেপে বসল। একটু আগে নরহরির বাড়ি থেকে ভাত খেয়ে এসেছি ।সদানন্দকে একটু ভয় পাইয়ে বললাম, জানিস তো এইসব ছিঁচকে চোরদের হাতে কিন্তু ভোজালি রামদা থাকে।
-অ-অত ভা-ভাববেন না স্যর। আমাদের তো পিস্তল আছে ।
হেসে উঠলাম। সে হাসি সদানন্দর ঠিক পছন্দ হল না। বসে বসে মশা মারতে লাগলো ।
       রাত আড়াইটে। সারাদিনের খাটুনির পর ক্লান্তিতে ঝিমচ্ছিআকাশে তখন ঝলমলে চাঁদ । বড় বড় গাছের মাথা গুলো বরফের ন্যয় শুভ্রগাছের ফাঁক দিয়ে রৌদ্রের মত চাঁদের আলো এসে পড়েছে জিপে । একটু তন্দ্রা যেতেই ধাক্কা দিল সদানন্দ । চমকে তার মুখের দিকে তাকালাম সে মুখে আঙ্গুল তুলে আমাকে চুপ করতে বলল ।তারপর একটা আঙুল তুলে সামনের দিকে দেখাল । বাইরে দেখি একটা সাদা গরু হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে । পাশে একটা আলো মতন । নড়ছে । মনে হয় চোরটা হাতে লন্ঠন নিয়ে নিয়ে এসেছে ! আজ তোকে ব্যাটা ছাড়ছি না! সশব্দে জিপ থেকে বার হলাম হাতে পিস্তলটা নিয়ে । ছুটে বেরিয়ে আসতে যাবো এমন সময় সদানন্দ হাত চেপে ধরে, না স্যর যাবেন না ওদিকে !
বিরক্ত হয়ে বললাম ‘রাখতো!’। জোরে ওইদিকে ছুটতে লাগলাম। তারপর কাছে গিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার রক্ত হিম হওয়ার জোগাড় ! পরিষ্কার চাঁদের আলোয় দেখতে পেলাম গরুটা আপন মনে চলছে । আর তার গলার দড়িটা এর এক মাথা সেই আলোটার সাথে রয়েছে । অদ্ভুত নীলচে এক আলো । তার কোন জ্যোতি নেই । দুলতে দুলতে গরুটাকে সে ধরে নিয়ে চলেছে ! যুক্তিবাদী মনটা তীব্রভাবে নাড়া দিয়ে উঠল। একি দেখছি আমি ! স্বপ্ন দেখছি নাতো! মন মানতে চাইলো না!  পিস্তল দিয়ে গুলি ছুঁড়লাম । চেঁচিয়ে উঠে বললাম, কে তুই ? এরপর যা দেখলাম সেটা অন্য কেউ দেখলে জীবিত থাকত পারতো না ! আলোটার আকার ক্রমশঃ বড় হতে লাগল মানুষের মতন। তারমধ্যে এক বীভৎস এক রক্তমাখা মুখ ।অদ্ভুত আওয়াজ করে বলতে লাগল ‘আমরা গো বাবু । বিশু মল্লিকের গরু আনার লোক । ব্রিজ থেকে পড়ে জলে ডুবে মরেছিলাম গো! এখন যখন ক্ষিদে পায় তখন শুধু গরু খাই আর কিচ্ছু ভাল লাগে না । এ কেমন শাস্তি বলুন তো, এ কেমন শাস্তি !’    আশপাশ থেকে কয়েকটা কান্নার রোল ভেসে এলো । সবাই বলতে লাগল, এ কেমন শাস্তি ! এ কেমন শাস্তি !       তারপর সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল গরুটার উপর । চোখের নিমেষেই গরুটার রক্ত ছাড়া কিছুই নেই!

      অজ্ঞান হয়ে শুয়েছিলাম। সকালে সদানন্দ উদ্ধার করে। ঘটনাটা রতনবাবু ছাড়া কাউকে বলিনি। পরে নাকি সে বিশু মল্লিককে বলেছিল। বিশু আবার গয়ায় পিণ্ডি ফিন্ডি দিয়েও এসেছিল । নরহরিকে এরপর আর থানায় দেখিনি । তবে এখনো নাকি ওই বাগানে গরুর হাড় পাওয়া যায় মাঝে মধ্যে!

সব ঘটনাটুকু শেষ করার পর আমার দাদা প্রবীর রায়কে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা, যত আজগুবি ঘটনা কি তোমার সাথেই ঘটে?
দাদা হেসে সিগারেটের সুখটান দিয়ে বলল, যারা ক্রাইম নিয়ে ঘাটাঘাটি করে তাদের সবার সাথেই এমন হয় রে। কিন্তু মুখ ফুটে বললে সবাই হাসবে! তাই আর বলে না !


                                                                  সমাপ্ত

Wednesday, 27 September 2017

গরুচোরের সন্ধানে প্রথম পর্ব - শোভন নস্কর



পত্রিকাটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে দাদা বলল, ছিছি এই গল্প লিখিস তুই!এভাবে লেখক হওয়া তোর কম্ম না! এসব ছাড় আর মন দিয়ে পড়াশোনা কর।আমি মুখ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। দাদা বলেই চলেছে, এত ভাল একটা তোকে কেসের কাহিনী দিলাম আর তার পিণ্ডি চটকে দিয়েছিস!
আমি কিন্তু গোঁ ধরে বসে আছি।গল্প না নিয়ে যাবই না।গল্প মানে হল দাদার কিছু রহস্যময় কেস।আগেই তো বলেছিলাম আমার মাসতুতো দাদা পুলিশের এক কর্তা।ছুটি পেলেই যাই কিছু কেসের খবর শুনতে পরে নানা পত্রিকায় ছেপে দেই।যাইহোক, দাদার বকা শুনেও দূর হলাম না।নির্লজ্জের মতন আরও একদিন পড়েই থাকলাম।পরদিন সকালে দাদা গম্ভীর-মুখে চা খেতে খেতে বলল,দুটি শর্ত আছে। আনন্দে লাফিয়ে উঠে বললাম, কি?

-এক তো অবশ্যই তোকে ভাল গল্প লিখতে হবে। দুই, গল্পের নাম দিতে হবে গরুচোরের সন্ধানে

-অ্যাঁ! এ আবার কি জঘন্য নাম! তুমি কি শেষ অবধি আমাকে গরুচোর ধরার কেস বলবে?!

-দিবি কিনা বল? নয়ত ফোট ।আমার আরও অনেক কাজ আছে।

বাধ্য হয়ে ঢোক গিলেই বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে ঠিক আছে। বল দেখি ।জম্পেশ রহস্যময় হওয়া চাই কিন্তু।

রোববার ছুটির দিনে দাদা রিল্যাক্সে সিগারেটটা ধরিয়ে আরামকেদারায় হেলান দিয়ে বলতে লাগল...
আমি তখন বনগাঁ থানায়।দুবছর সেখানে পোস্টিং হয়েই ভাল ভাল কয়েকটা কেস সলভ করতেই বেশ জনপ্রিয় হলাম আমি।পথেঘাটে লোকজন বেশ সম্মান জানাতো। বনগাঁ বাংলাদেশ সীমান্তের একটা বড় শহর। কিন্তু ব্ল্যাকের কারবার ঠেকাতে নাজেহাল হতে হত পুলিশের।ধনী ব্যবসায়ীরা পুলিশ বিএসএফদের কিনে রাতের অন্ধকারে ব্ল্যাকের ব্যবসা করত।প্রথম দিকে অনেক ধরনের মাল পাচার হত কিন্তু শেষের দিকে গরুটাই বেশি পাচার হত।লাভ ছিল অনেক বেশি।বাইরে থেকে বড় বড় গরু নিয়ে এসে বাংলাদেশে পাচার করা হত।

পাচার করার জন্য পরিণত মাথার বুদ্ধি ছিল।কিছু কিছু বিএসএফ দের সাথে চুক্তি থাকত।ব্ল্যাক কারবারিদের তারা একটা টাইম বলে দিত। সেই নির্দিষ্ট সময়ে পাহারাদার অন্য দিকে যেত।তখন চুপি চুপি কাঁটাতার কেটে রাতের অন্ধকারে নদীতে নেমে পড়ত।রাতারাতি কিছু আয়ের জন্য গরীব কিছু ছেলে এই কাজ করত।এদের ভাগ্য যে সবসময় সুপ্রসন্ন হত তা কিন্তু নয়।মাঝে মাঝে বিএসএফদের সাথে মালিকের ঘুষ নিয়ে বচসা হলে বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গরু পার না করতে পারলে তাদের খুন করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হত।নয়ত প্রচণ্ড মার।কেউ তাদের খোঁজ নিতনা। এমনকি মালিকও না। বলির পাঠা হয়ে যেত এরাই।রাতের বেলায় আমিও অনেক টহল দিয়েছি ধরার জন্য।কিন্তু কোথায় কি! আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে কোথায় বেড়িয়ে যেত কে জানে!পুলিশের মধ্যেও তো অনেক দুর্নীতি ।শেষকালে মনে হল হাল ছেড়ে দেই। তখনই একটা অদ্ভুত কেসের সন্ধান পেলাম বনগাঁর পাশেই একটা ছোট্ট গ্রাম ঝাউডাঙ্গা থেকে।ঘটনাটা গাঁজাখুরি বলে উড়িয়েও দিতে পারিস তবু আজো ভাবায় আমাকে।সেটাই বলছি শোন ।
তখন জ্যৈষ্ঠমাস।বর্ষার আগের গরমে নাজেহাল অবস্থা।তারওপর গত রাতে গরু পাচারকারীদের ধরতে গিয়ে সারারাত ঘুম হয়নি।থানায় এসে কাজ করা তো দূরে থাক এসে ঢুলছিলাম।সদানন্দ ঘোষ তখন হাবিলদার।নিশ্চিন্ত মনে ঝিমচ্ছিলাম হতভাগাটা এসে জাগিয়ে দিল।হতদন্ত হয়ে এসে বলল, স্যর শুনেছেন ? আমি চমকে উঠে বললাম , কি কি!কি হয়েছে।

-স্যর আবার চুরি!

-কো-কোথায়?

-স্যর ঝাউডাঙায়।

বিরক্ত হয়ে গেলাম।এই গরুপাচার ধরতে ধরতেই আমার পুলিশজীবনে না কালশিটে পড়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হত গা দিয়েই গরুর গন্ধ বেরুচ্ছে!বললাম, ধ্যাত্তেরি আবার!
-না স্যর এটা অন্য ব্যাপার।গরুপাচার নয় গরুচুরি।

-বলিস কি হে!

-সত্যি স্যর। বাইরে এসে দেখুন একজন এসেছে।
বাইরে গেলাম।এসে দেখি এক মধ্যবয়স্ক চাষা বসে আছে।জামা পড়লেও কাঁধে আবার গামছা।আমাকে দেখেই পা জড়িয়ে ধরল।কেঁদে বলল, বাবু সাহায্য করুন।নয়ত সব যাবে।
-আ-আচ্ছা ঠিক আছে।হলটা কি?

লোকটা উঠে বলতে লাগল, বাবু বাপের সূত্রে পাওয়া একবিঘা জমি আছে।ঐ চাষবাস করি আর একখান গরু আছে।মাসখানেক আগে গরুটা চুরি যায়।অনেক কষ্টে আরেকটা কিনেছি।কাল মাঝরাতে একটু উঠেছি, গোয়ালে গিয়ে দেখি গরুটা নেই।এরমধ্যে আরও কয়েক বাড়ি থেকে গরু চুরি গেছে। কি করব বাবু বলেন!সবাই গরীব মানুষ। গরু চলে গেলে বাঁচবো কি করে!


গরিব মানুষের অসুবিধা কম মনে থাকে।ইতিমধ্যে মন্ত্রী আসবে এই ঝামেলায় দুদিন চলে গেল।তারপর একদিন সদানন্দকে বললাম চল তো ঘুরে আসি।বনগাঁ থেকে একটু বাইরের দিকে গেলেই পড়ে যেত প্রত্যন্ত গ্রাম।জিপে করে সরু পিচের রাস্তা দিয়ে যেতে লাগলাম। চারিদিকে সবুজ আম জাম গাছের বন কিছুক্ষণের জন্য মনটা হাল্কা করে দেয়।বাগানের ওদিকটায় নদী।ওটা পার হলেই বাংলাদেশ। মাঝে মাঝে বিএসএফ ক্যাম্প। এমন পরিবেশে মনটা স্বাভাবিকভাবেই ভাল হয়ে গেল।
গ্রামে ঢুকতেই জলখাবার নিয়ে হাজির সেই মধ্যবয়স্ক চাষী নরহরি ঘোষ । মনে হচ্ছিল কোন কেস না বেড়াতে এসেছি।

-বাবু, এই আমাদের ঘর।আর এ-এই হচ্ছে গোয়াল।দেখুন কেমন শূন্য হয়ে আছে! আপনিই পারেন একমাত্র চোরগুলোকে ধরতে।

কোনরকমে তৈরি পাকা বাড়িটার মাথায় টালি দেওয়া। গোয়ালটা মাটির। কয়েকজন উঠানে ইতিমধ্যে হাজির হয়েছে ।তাদের কয়েকজন এইসব সমস্যা নিয়েই অভিযোগ করে গেল।
বেরোতে বেরোতেই দুপুর পেড়িয়ে গেল।সদানন্দকে বললাম চল তো চারিপাশটা দেখে আসি। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে গোয়ালঘরের পিছন টা দেখলাম । বিশাল এক তেঁতুল গাছ সেখানে।নিচে আগাছার জঙ্গল।একটু এগিয়ে একটা পুকুর দেখতে পেলাম ।কিছু মাছরাঙা ছাড়া আর কিছুই নজরে এলোনা। একদম নিস্তব্ধ পরিবেশ।জঙ্গলটা পেড়িয়ে যেতেই একটা বড় পিচের রাস্তা চলে গেছে পাশের বড় জঙ্গলটার ভিতর দিয়ে। সদানন্দ বলল, স্যর, এই রাস্তাটা বেশিদিন হয়নি।এখানকার পঞ্চায়েতপ্রধানই করেছেন অনেক চেষ্টা করে ।

-এতে কৃতিত্বের কিছু নেই সদানন্দ ।

-কেন স্যর ?

-আরে কখনো ভেবেছ রাস্তাটা কোন দিকে যাচ্ছে? বর্ডারের পাশে। যাতে নিশ্চিন্তে ব্ল্যাক করা যায়। এমন ঘুষখোর নেতা তো দেশে এখন ছড়াছড়ি। কেস একদম পরিষ্কার। গ্রাম থেকে চুরি করে গরু পাচার করে দাও। ডাবল লাভ! তা নাহলে এই ফাঁকা জায়গায় কেন পিচের রাস্তা করতে যাবে? কিভাবে মানুষকে এরা চুষে খাচ্ছে।

ফেরার পথে নরহরিকে রাস্তার কথা জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল, ওই রাস্তায় বাবু তেমন কারোর যাওয়ার দরকার পড়ে না।শুধু স্কুলে যেতে মাঝে মাঝে বাচ্চারা ওই রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যায়।

-ঠিক আছে এবার থেকে রাতে দুজন করে কনস্টেবল থাকবে ওই তেঁতুল গাছের দিকটায় । ওখান থেকে সবটা দেখা যায় পাড়াটার।
কয়েকদিন এভাবে কেটে গেল। তারপর একদিন সদানন্দ এসে বলল, স্যর আবার! ভুরু কুঁচকে বললাম, মানে?


-স্যর, ঝাউডাঙায় আবার-

মহুয়া - শুভদীপ বন্দোপাধ্যায়

সুচিত্রা সেন দর্শকের আসনে উত্তর কলকাতার এক জলসায়।একই মঞ্চে গাইবেন সন্ধ্যা শ্যামল হেমন্ত।সে আমলে এমনি অস্থায়ী স্টেজেও আজকাল যাকে বলে মাচা, স্বনামধন্য শিল্পীরা অংশ নিতেন।
সেখানে মিসেস সেন র সামনে প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে নাচছে একটা সাত বছরের বাচ্চা মেয়ে শিপ্রা।সুচিত্রা মুগ্ধ হন সেই বাচ্চা মেয়েটির নাচ দেখে।সে সেদিন চটুল হিন্দি সিনেমার গানের সঙ্গেই নেচেছিল।'দিল ভিল, প্যার প্যার, ম্যায় কেয়া জানু রে’র তালে তালে জন্ম হল ছন্দিত সোনালি রায়ের।মন্ত্রমুগ্ধ দর্শকরা সে দিন জানতেও পারেননি তাঁরা এক ইতিহাসের সাক্ষী রয়ে গেলেন। এক তারার জন্মলগ্ন প্রত্যক্ষ করলেন।বানিজ্য বসতে টলি লক্ষী সুচিত্রা সেনের উত্তরসূরী তৈরী হল সেদিনই সুচিত্রার সামনে।
নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী নাচতেন উদয় শংকরের দলে।নামী এডিটরের শাগরেদি করেছেন, বম্বে পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছেন যশের আশায়, অর্থের সন্ধানে।লাভ হয়নি।ফিরে এসেছিলেন কলকাতায়। কনিষ্ঠা কন্যা শিপ্রা তখন সবে চার বছরের শিশু। তাতে কী! তাকেই নামিয়ে দিলেন পাড়ায় পাড়ায় জলসার আসরে।তখন জলসা মানে সব বিশ্ববন্দিত শিল্পীরা গাইছেন।সেখানেই নাচ শুরু শিপ্রার।নাচের আসরে সেই ছোট্ট মেয়েটার নাম পাল্টে হল সোনালী রায়।এরপর সব জলসা মাতিয়ে রাখল সোনালী রায়।খেলনাবাটি খেলার বয়সেই তাকে টাকা রোজগার র জন্য নেমে পড়তে হল।
এরপর সুখেন দাসের "নয়া মিছিল" ছবির জন্য নায়িকার খোঁজ চলছে।নীলাঞ্জন সোনালী ওরফে শিপ্রাকে নিয়ে গেলেন।কিন্তু রোগা চেহারা হওয়ায় সিল্কেট হলনা নীলাঞ্জনকন্যা।স্টুডিয়ো চত্বর ছেড়ে ভগ্নমনোরথ পিতাপুত্রী যখন বাড়ির পথ ধরেছে। পিছু ডাকলেন সুচিত্রা সেনের ব্যক্তিগত মেকআপ-ম্যান হাসান জামান।আবার সেই সুচিত্রাযোগ।হাসান জামানই যেন বদলে দিল শিপ্রার ভাগ্যযোগ।হাসান জামান বললেন তরুণ মজুমদার তাঁর আগামী ছবির জন্যে প্রথম যৌবনা নতুন মুখ খুঁজছেন।
সিলেক্টেড।
কাঁচামাটির তাল নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন সন্ধ্যা রায়! অস্থায়ী স্টেজের অখ্যাত এক রোগাসোগা শিশুশিল্পীকে অপত্য স্নেহে অভিনয়ের পাঠ স্টাইল গ্রুমিং সব দিয়ে তরুন সন্ধ্যা গড়ে তুললেন দেবী মূর্তি শিপ্রা সোনালী থেকে মহুয়া রায়চৌধুরী।
শ্রীমান পৃথ্বীরাজ-এর বউ থেকে প্রেয়সী হবার যাত্রা শুরু হল নতুন নামে।বাংলা চলচ্চিত্রে নায়িকা অধ্যায়ে নবতম সংযোজনের নামকরণ করা হল মহুয়া রায়চৌধুরী।মহাতারকা ব্লকবাস্টার নায়িকা।
কিন্তু সত্তর দশকের মাঝে উত্তম কুমার র সঙ্গে "সেই চোখ","বাঘবন্দী খেলা","আনন্দ মেলা" র মতো ছবি করেও মহুয়ার ক্যারিয়ারে ঢলতি চলে আসে।তখন বিভিন্ন ছবি "মাদার" "কবিতা" ছোট খাটো রোলও করতেন মহুয়া।ঘুরে দাড়ালেন আবার তরুন মজুমদারের হাত ধরে আশি সালে "দাদার কীর্তি" র সরস্বতী হয়ে।আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।বানিজ্য বসতে মহুয়া হয়ে দাড়ালেন তিনি।তাঁর ছবি পোষ্টারে থাকলেই হল হাউসফুল।
অগ্নিদগ্ধ হয়ে অকাল আকস্মিক মৃত্যুতে চলে যাবার পর শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিল। সেটা তপন সিনহার কাছেই রয়ে গেল। আদমী অউর অউরত তে কি অসাধারন অভিনয়।
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় একবার ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন‚ তাঁদের মা খুব কষ্ট করে বড় করেছিলেন তাঁদের। স্টুডিওতে ঘুরে ঘুরে শাড়ি বিক্রি করতেন বলিউড তারকা বিশ্বজিৎ জায়া রত্না চট্টোপাধ্যায়।একদিন তাঁকে ওই অবস্থায় দেখে মহুয়া রায়চৌধুরী সব শাড়ি একবারে কিনে নিয়েছিলেন।এরকমই ছিলেন মহুয়া।দিলীপ রায় পরিচালিত অপর্না সেন অভিনীত বিতর্কিত ছবি "নীলকন্ঠ"।এক বোনের সোনাগাছির পতিতা হয়ে যাওয়া ও তাকে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার গল্প।তাতে ছিলেন মমতা শংকর মহুয়া লিলি আরো অনেকে। "নীলকন্ঠ" তে প্রসেনজিৎকে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন মহুয়াই।
আজ 24 সেপ্টেম্বর বাংলা ছবির রূপোলী পর্দার সোনার প্রতিমার জন্মদিন।

Tuesday, 26 September 2017

সাঁ কো বি ষ য় ক -সুতীর্থ



কিভাবে ডাকলে বলো পাল্টে দেবে চোখের দৃষ্টিরেখা ; মাংস হাড় পাঁজরের ভিতরে আটকে থাকা তোমাকে আবিষ্কার করবো চারপাশের গুলঞ্চ-লতায়..

বুঝি এতদিনে ঈশ্বর বেড়িয়েছেন সহজের খোঁজে , সহজ মানুষ একবার ছুঁয়ে দিলে আশরীর জুড়িয়ে যেত সমস্ত সন্তাপ..

কোনদিকে আলো ফেলছো আলো.. এদেশে প্রতীক্ষমাণ শয়ে শয়ে আলো-হীন চোখ শাসিত হচ্ছে বিদ্যুৎ ও বারুদে..

ইচ্ছে হলে দু'আঙুলে টিপে মারতে পারো, বুঝি এতটাই সহজলভ্য মানুষের জান.. মোমবাতি মিছিল শেষে তোমাকে এ সমাজ মনেও রাখবে না..

শিকড় খুঁজি না কেউ, শুধু গাছের পাতাগুলো ধুয়ে মুছে রাংতা মাখাই..
দ্রুত অসুখ ছড়িয়ে পড়ে শাখা প্রশাখায়

লক্ষ্য পরিণত হলে কারুকার্যময় বৃত্তে তার দেওয়াল ধরে কেবল দৌঁড়োনোই যায়, কোথাও পৌঁছনো হয় না

সমস্ত ভাঙনের মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছো তুমি, বোঝো! দেখবে চারপাশের মানুষজনকে আঁকড়ে ধরছো খুব করে

দুটো মানুষ যখন কাছাকাছি আসে ; আমি একটি সাঁকোর কথা ভাবি..

যা কিছু মিথ্যে তা মিথ্যেই , অভিনয় নেই
স্বপ্নকে বাতাস থেকে শ্বাস নিতে দাও
১০
নিজের ঘরটুকুকে সাজিয়ে দিতে পারলেই বাইরেটা যথাযথ সাজানো গুছানো পরিপাটি..

ইচ্ছে গাছ ৭/ “কঙ্কাল”, শেষপর্ব --আকাশলীনা দে

আমার ইচ্ছে গাছ... আমার আর নিরুর... নাহ... ওকে নিরু ডাকার অধিকার আমি নিজেকে আর দিতে পারছি না... নিরুপমার ইচ্ছে গাছ... যতদূর বাজ পড়েছে নাকি কোন ক্ষয় অসুখ ধরেছিল জানিনা... অভিমানের মত কালো স্তুপ হয়ে পড়ে আছে... নিরুপমাদের বাড়িটার দশাও তথৈবচ। নিরুপমার বাবা মারা গেছে... মা বলছিল... আর মনে হয় নিরুপমাও কথাও চলে গেছে।
নিরুপমা, তুমি কি আমার জন্য অপেক্ষা করেছিলে...? কতদিন...? ভাগ্যিস বেশিদিন নয় ... আমি তোমার সামনে আসতে পারতাম না... কীভাবে বলতাম যে আমি মনে রাখতে পারিনি... ধরে রাখতে পারিনি।
সুতরাং মনটা তেতো হয়ে রইল।
**************************************************************************************
কয়েকদিনের মধ্যেই আমি ব্যাবসা বুঝে নিলাম... লাভও হতে লাগল... আর আমি নিরুপমাদের বাড়িটা কিনে নিলাম... ওদের জায়গা সমেত।
অবচেতনে এই কাজটা করার ইচ্ছা আমার বহুদিন ছিল... ইচ্ছে হত এই বাড়ি কিনে নিয়ে ওর ওই মাতাল বাপকে গলা ধাক্কা দিয়ে বার করে দেব, সব নিরুর জন্য। এখন রাগটা কার উপর বেশি জানি না... নিরুপমার বাবা... নাকি নিরুপমার উপর। নাকি রাগের চাদরে আমি নিজের অপারগ মুখটা ঢাকতে চাইছি।
ইতিমধ্যে কায়ার সাথেও আমার বনিবনা হচ্ছিল না। জেনেবুঝে আমারা দুজনেই ঝাঁপটা দিয়েছিলাম... পস্তাচ্ছিলাম দুজনেই। কিন্তু কায়া রীতিমত আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে... ওকে দোষ দেব না। আমি তো আমার জায়গাতেই ।। কিন্তু ও সব ছেড়ে... বন্ধুবান্ধব চেনা জায়গা...বাবা মা... তারওপর প্রেগন্যান্সি।
ও যেসবের মধ্যে বড় হয়েছে তার কোন সুবিধাই এই গ্রামে নেই... প্রেমের চাদরটা সরে যাবার পর ও ওর ভুলটা বুঝতে পারছে।ক্রমাগত বলে চলেছে যে ওর জীবনটা শেষ হয়ে গেল তার জন্য আমি দায়ি...
মা বললেন বাচ্ছা মেয়ে... প্রথমবার বাচ্ছা হচ্ছে নতুন জায়গায় মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে... তাই আমি কিছুদিনের জন্য ওকে শহরে ওর মা বাবার কাছে পাঠিয়ে দিলাম...
নাহ্‌ ! কায়াই এখন আমার জীবন আমাদের ভবিষ্যৎ ... ওকে আমি ভালবাসি... কথটা মনে মনে একটু জোর দিয়েই বললাম... একটা পরিকল্পনা ছিল আমার...
নিরুপমাদের বাড়িটা রেনভেসান করে আমি ওখানে ওকে শহরের সব সুবিধা এনে দেব... ওর ছোট্ট দুনিয়া তৈরি করে দেব। বাবা মা ও আমার এই চিন্তায় একমত হলেন... সম্পত্তি ফেলে রেখে ঘুন ধরানো তো উচিৎ না।
যথারীতি কাজ শুরু হয়ে গেল...
মাঝখানের বেড়াটা উপড়ে ফেলা হবে... ইচ্ছে গাছটাও।
গাছটাকে কাটতে খুব একটা বেগ পেতে হল না... কিন্তু এর শিকড় যে বহুদুর গেছে... অনেক গভীরে। শিকড়কে কি উপড়ে ফেলা অত সহজ... আমি বসে লোকগুলোকে কসরত করতে দেখছিলাম...
- দাদা!! একবার জলদি একটু এদিকে আসবেন... হঠাৎ যেন একটু জটলা বেঁধে গেল ওই দিকটাতে...
- হ্যাঁ?! কী হয়েছে... উপড়াচ্ছে না ? বলতে বলতে আমি এগলাম
কাছে গিয়ে যা দেখলাম... আমার মাথা ঘুরে গেল...
***************************************************************************************
কঙ্কাল... একটা ৫/৭ বছরের বাচ্চার কঙ্কাল...
তারপরে থানা পুলিশ... যদিও আমাদের সেসব ঝক্কি পোহাতে হয়নি... সেসব বাবাই দেখে নিয়েছেন...
পুলিশ জানাল কঙ্কালটা একটা বছর পাঁচেকের মেয়ের কঙ্কাল ... খুব একটা নতুন না... খুব বেশি হলে বছর ২০ আগেকার... মৃত্যুর কারন শ্বাসরোধ বা সাডেন নেক ইনজুরি... অর্থাৎ ঘাড় ভেঙ্গে মৃত্যু...
আমার কিছু ভাবতেই ভয় করছিল... তার আগেই মা কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে বলে উঠলো ...
- আমি তোমাকে বলেছিলাম না মেয়েটাকে জানোয়ারটা শেষ করে দিয়েছে... সেই রাতে ওরকম চিৎকার চেঁচামেচির পর থেকে আমি আর কোনদিন মেয়েটাকে দেখনি... বলে কিনা মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে ... ওই ইতরতাই মেয়েটাকে খুন করে গাছের নীচে পুঁতে দিয়েছিল... আমি কেন কেউই তো কোনদিন আর দেখতে পায়নি মেয়েটাকে... আমি বলেছিলাম!!... মা কেঁদেই চলল
আমার মাথাটার মধ্যে যেন কেউ কপ্পুর ঠুসে দিয়েছে...
বলতে গেলাম – আমি দেখেছি... আমার নিরু... ওকে আমি বহুদিন চিনতাম... ৫ বছর! এ কিকরে সম্ভব! আমি তো সাতের নিরুর সাথে দোল খেয়েছি ওই গাছের ডালে... ১৩র নিরুর সাথে গান শুনেছি ...১৮র নিরুকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছিলাম যে আমি ফিরে আসব... তবে...
তবে এর একটা কথাও আমার মুখ দিয়ে বেরল না... আস্তে আস্তে হেঁটে নিরুর বাড়িতে ঢুকলাম... যদিও বাড়িটা এখন আমার আর কায়ার বাড়ি।
পুরো বাড়িটার ভোলই বদলে গেছে... মারবেলের মেঝে... আধুনিক আলো... সুদৃশ্য কীচেন... আর কায়ার পছন্দের পিয়ানো।
পিয়ানোর সামনের টুলটায় বসে লিডটা ওঠালাম... আর তক্ষুনি পিছন থেকে দুটো হাত আমার চোখ চেপে ধরল...
***************************************************************************************
চমকে পিছনে ঘুরে দেখলাম কায়া হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে... ওকে অপূর্ব লাগছিলো... লাবণ্য ঠিকরে পড়ছে... হাঁপ ছাড়লাম ...
- একী তুমি!! ভয় পাইয়ে দিলে তো...
- এইমাত্র এলাম... একাই...
- তুমি... এভাবে একা... কেন? আমাকে খবর দিলে না...
- না নাহ্‌... ডাক্তার বলেছে আমি একদম ফিট... তার উপর তোমাকে না দেখে এতদিন থেকেছি কখনো? কায়া ঝলমলিয়ে হাসল...
- হুম্... হবু মায়ের তো নিজের মায়ের যত্ন পেয়ে দেকছি গ্লামার একেবারে ঠিকরে পড়ছে...
কায়া যেন কথাটা গায়েই মাখল না...
- চল ওঠ... তোমাকে কিছু বাজিয়ে শোনাই...
- আরে সেসব পরে হবে ... আগে বিশ্রাম...
- না এখনই... কায়া বসে পড়ল... আঙুলগুলো একবার পিয়ানোয় বুলিয়ে নিল...
আর তারপরে প্রত্যেকটা সুরকলি যেন ও পিয়ানোর কী তে না ... আমার পাঁজরে বাজাচ্ছিল...
“ওগো নিরুপমা করিও ক্ষমা তোমাকে আমার ঘরনি করিতে আমার মনের দোসর করিতে পারিলামনা পারিলামনা তো কিছুতেই...”
আমার মেরুদণ্ড দিয়ে যেন কোন সরীসৃপ উপর নীচ করতে লাগল... বুকে হাতুড়ী পিটছিল...
-এই গানটা... কায়া?
-কারন গানটা আমাকে নিয়ে লেখা!! ভুলে গেলে বুঝি...? কায়া হাসল...
-হ্যাঁ নিরুপমা হ্যাঁ!! আমি ভুলে গেছিলাম... আমাকে ক্ষমা করে দাও নিরু... আমি কথা রাখতে পারিনি... আমি শুধু তোমাকে ভালবাসি... আমি সেই ১৩ বছরের ছেলেটার মত কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম... যে বলেছিল নিরুপমাকে এসবের থেকে বহুদুরে নিয়ে যাবে ...
-কে বলল তুমি কথা রাখনি... নিরুপমা সেই আগের মত আমার গলা জড়িয়ে ধরল ...
তুমি বলেছিলে আমাকে মুক্তি দেবে... দিয়েছ... ইচ্ছে গাছের সাথে আমি আর বাঁধা নেই... আমি মুক্ত...আমিও আমার কথা রেখেছি... এখন আর আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না ...
-না ! কেউ পারবে না... আমি কায়ার... নাহ্‌ নিরুর হাতদুটো চেপে ধরলাম...
সমাপ্ত

Monday, 25 September 2017

"যেও না, দাঁড়াও বন্ধু ! ..." -সুতীর্থ


তোকে দেখলেই প্রেমের কবিতা ঝাপটায়
যত মেলে দিই নিজেকে দুঃখী বিশ্বে
হাতে উঠে আসে প্রস্ফুটিত গোলাপটা
অর্ধ-জীবন থমকায় এই দৃশ্যেই
ফুটপাত ধরে হেঁটে চলা শ্রান্ত বিকেলে
কাঁধের ব্যাগটি দূরুত্ব ভেঙে চেনা দেয়
'অটো না ধরে হেঁটে হেঁটে আজ এদিকে!'
শেষ রোদ্দুর লাবণ্য ছুঁলো মিনারে..
বেশিখণ নয় , দু'পা এগোতেই সন্ধ্যা
লুফে নেয় তোকে গড়িয়া ফেরত বাসরুট
সমাজের কাছে তুই যে এখনো বনসাই
বুকের নদীতে ঢেউটুকু জান অশ্রুই ..

ইচ্ছে গাছ ৬/ “করিও ক্ষমা” আকাশলীনা দে

কয়েকবছর পরে শেষবারের মত আমি আর নিরুপমা আমাদের ইচ্ছে গাছের নীচে বসেছিলাম। আমার পরদিন ভোরের গাড়ি। শহরের ইউনিভারসিটি।
- কালকে একদম সকালের ট্রেন ... পৌঁছে চিঠি লিখব।
- -হুম...
- গোছগাছ শেষ...
- -হুম...
- কী হুম হুম করছ নিরু... তুমি এখানে কেন পরে থাকছ... আমার সাথে কেন আসছ না?
- আমি চলে গেলে বাবাকে কে মনে করাবে যে মদ খেলে কোন রাক্ষসটা ওর উপর ভর করে!!...
- ওই লোকটার জন্য তুমি সারাজীবন...
- সারাজীবন কই? তুমি কথা দিয়েছ না আমাকে মুক্তি দেবে... আমি কিন্তু ভুলিনি... নিরুপমা হাসল... এই হাসিটার মধ্যে কেমন জানি একটা ব্যাঙ্গ মেশানো ছিল... এমনভাবে নিরুপমাকে সচরাচর দেখি নি
আমি অতটা আমল না দিয়ে বললাম
- আমিও ভুলিনি নিরু...মনে রাখব ...
তবে মনে রাখা অতটা সোজা নয়... ওইবয়েসের মন থাকে নাভির নীচে।
************************************************************************************
ইউনিভারসিটির প্রথম বছরেই আমার পরিচয় হয় কায়ার সাথে। বন্ধুমহলে এমনকি শিক্ষকমহলেও আমাদের বেশ একটা “লাভবার্ড” ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে...
তাই যখন ভার্সিটির ডিগ্রি বিতরণের দিনই আমার আর কায়ার বিয়ের কার্ড বিতরন হয় তখন কেউই তেমন কিছু অবাক হয়নি... তবে আসল কারণটা আমাদের খুব কাছের গুটিকতক বন্ধুরাই আন্দাজ করেছিল...
কায়ার প্রেগন্যান্সিটা প্ল্যানমাফিক ছিল না কিন্তু আমি ভীষণ খুশি ছিলাম...
বিয়েটা শহরেই হয়... আমরা ভয় পাচ্ছিলাম যে গ্রামে গেলে হয়ত বিয়ের আগেই কোনভাবে জানাজানি... আর তারপর অবাঞ্ছিত কিছু অশান্তি হবে... তারথেকে কায়ার মা বাবা বন্ধুরা, আমার ভার্সিটির বন্ধুরা সবাই এখানেই ছিল... আমার বাড়ির লোকজন বিয়ের দুইদিন আগে এসে হাজির হল...
সব কাজকর্ম সুমঙ্গলম সুসমাধা করে কায়াকে নিয়ে গ্রামে ফিরে গেলাম... বাবার ইচ্ছেমতই তার দিগ্রিধারি ছেলে এবার তাঁর ব্যাবসা সামলাবে...পাক্কা ৪ বছর পর বাড়ি ফিরে ।
তবে বাড়ির সামনে আসতেই একটা বড় চমক আমার জন্য অপেক্ষা করছিল ... সবাই তখন কায়াকে বরণে ব্যাস্ত...
ক্রমশ

Sunday, 24 September 2017

ইচ্ছে গাছ ৫ / “…জানে আমার প্রথম সবকিছু” আকাশলীনা দে

মনে আছে… নিরুপমার সাথে সেই প্রথম আর শেষবারের মত ঝগড়া করেছিলাম।
- কীরে এতো দেরি করছিস কেন? নীচে সবাই বসে আছেন... বাবা রাগ করছেন তো...
- আমি আসছি মা এক্ষুনি। আমার ২তলার ঘরের জালনা দিয়ে আমি রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি ...
- এখনও কী কেউ আসতে বাকি আছে, যাকে তুমি ডেকেছ? বাবা ঘরে ঢুকলেন...
- না বাবা মানে নি... না মানে আমি একটু নীচ থেকে আসছি... এক্ষুনি চলে আসব...
- ঠিকাছে যাও, তবে ১০ মিনিটের মধ্যে... নিমন্ত্রিতরা সবাই অপেক্ষা করছেন... বাবা চলে গেলেন।
বাবার কথার অবাধ্য হবার মত কোন হাড় আমার শরীরে তখনও গজায়নি, আজও গজায়নি, ভবিষ্যতেও বিশেষ আশা দেখি না... আমি জুতোটা গলিয়ে নিরুর বাড়ির দিকে দৌড় লাগালাম।
বেড়ার ফাঁকটা দিয়ে খুব সাবধানে পার হলাম, নতুন পাঞ্জাবিটা ছিঁড়লে মা আমাকে আর আস্ত রাখবে না...
অনেক নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ত্যাগ করে... অনেক হাত মাথা ঝাঁকিয়ে আমি নিরুর বাড়ির দরজায় একটা টোকা মারার সাহস জোগাড় করলাম... দরজা যেন নিরুই খোলে... ভগবান...
- কে? কী চাই... নিরুর বাবা দরজা খুলল... এই লোকটার প্রতি আমার কিছুমাত্র সম্মান নেই। বিরক্তি আড়াল করে বললাম..
- নিরুপমা আসবেনা?
- কোথায়? নিরুর বাবা একটু অবাক, বিরক্তও... না! নিরুপমা বাড়ি নেই...
- অহ্‌ ... বলে আমি সোজা পিঠ দেখিয়ে দৌড় ওখান থেকে...
স্বাভাবিক যে নিরু ওর বাবাকে নিমন্তন্নের কথা বলেনি... ওই লোকটার সাথে এক বাড়িতে মানুষ থাকে কীভাবে! কেমন মাতাল খুনি চেহারা... ঘরের ভেতরটা ভ্যাপসা পচা গন্ধ... এই বাড়িতে নিরুপমা থাকে! পাঁকে পদ্মফুল ফোটা এর এরথেকে অনেক সোজা কাজ...
কয়েক ঘণ্টা পরে সব নিমন্ত্রিতদের হাসিমুখ দেখিয়ে আমি ওই ভিড় থেকে চুপিচুপি কেটে পড়লাম... এসে বসলাম গাছতলায়... যেটাকে আমার বেশি ঘর বলে মনে হয়... যে জায়গাটা শুধু আমার আর নিরুর ... আর কেউ যেন কাছাকাছিও না আসে।
রাতের অন্ধকারে যেন গাছের নীচটা আলো আলো লাগে...
কোটরে এখন আর বসে পা দোলাতে পারি না... পা মাটিতে ঠেকে যায়... বাবা বলেছে কলেজের পড়া আমি শহরে থেকে পড়ব ... ফিরে এসে ওনার জমজমাটি ব্যাবসার জাঁক আরও বাড়াব... আমার ব্যাবসা ভালো লাগে না... অবশ্য আমার মনে হয় না সেই “ ক্যারিশমা” আমার আছে... যেটা বাবার আছে... আমি শহরে যেতেও চাইনা...
পাঞ্জাবীর পকেট থেকে মাউথঅরগানটা বার করে ঠোট ছোঁয়ালাম
“ Oh my precious ember burning, my sweet glowing light From the moment I first saw you I was yours and you were mine Deep down we both knew you were trouble by design And the echo of my mother's words, "baby don't you play with fire" I was always playing the part first love only set by a spark There was no way changing my mind...”
হঠাৎ ...
- “Now I'm under your spell, trapped in a lie Shouldn't have stood that close to the fire...”
নিরুর গলা... চোখ খুললাম না... রাগটা মাথায় চিড়বিড় করে উঠল এবার... নিরুর বাবার উপর...
- ওই লোকটা তোমায় আসতে দেয়নি না!! আমি জানতাম ! মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম মিথ্যে বলছে... এই দিব্বি দিলাম নিরু ওই লোকটাকে আমি একদিন খুন করে ফেলব... তুমি... তুমি হাসছ...
আমার রাগ আস্তে আস্তে গলে চোখের কোণায় জমা হচ্ছিল... কিন্তু নিরুর ঠোঁটের কোণায় একটা হাল্কা হাসি ছিল...
- বাবা কিছুই জানেন না... আমিই আসিনি...
- মানে! কেন??!! তুমি তো বলেছিলে আসবে... কী ভুল করলাম আমি...
- চুপ কর একটু... নিরুর এই দৃঢ় গলায় আমি বাকি কথাটা গিলে নিলাম...
- একবার দেখো আমার দিকে... আমি কীভাবে যাব তোমার বাড়িতে ? আমি যে কিছু উপহার নিয়ে যাব সেই সঙ্গতি আমার নেই... এইভাবে গিয়ে কাকে কাকে অপমান করব...? বাবাকে... তোমার মা বাবাকে, তোমাকে? নিজেকে!...
নিরু পা মুড়ে ঘাসের উপর বসে পড়ল... মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে... হাঁপাচ্ছিল যেন...
আমি দেখলাম... নিরুর জামাটা বড্ড পুরনো... ওকে আমি অন্য কোন জামায় আর দেখেছি বলে মনে পড়ছে না... কোনদিন খেয়ালও করিনি সত্যি বলতে। আমার সব রাগ দুচোখ বেয়ে নেমে গেল...
আমি ওকে এসব থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাব... এটা ওর প্রাপ্য না... ওর বাবার ওর মত মেয়ে প্রাপ্য না...
আমি নিরুপমাকে কাধ ধরে তুল্লাম...
- আমি তোমাকে এসবের থেকে একদম অনেক দূরে নিয়ে চলে যাব নিরু... তোমাকে মুক্তি দেব... তারপর আমরা একসাথে... কেউ আলাদা করতে পারবে না আমাদের...
- ...
- তুমি আমার সাথে শহরে যাবে...
- কিন্তু আমি যে এখানেই বাঁধা... এখানেই আমার জন্ম... আর এখনেই আমার সবকিছু... তুমি যাও শহরে...
- কিন্তু তুমি? তোমার কী হবে...
- কেন তুমিই যে আমকে মুক্তি দেবে বললে... তুমি ফিরে আসবে... তারপর আমরা সারাজীবন একসাথে ... কথা দিলাম...
নিরুর মুখে হাসি খেলে গেল... এই হাসিকে বর্ণনা করার মত কলম আর ভাষা আছে কিনা আমার জানা নেই...
- এতসবের পরও তুমি কীকরে এতো সরলভাবে হাসো নিরু... তোমার মনটা কী দিয়ে তৈরি? তোমাকে কি কিছুই ছুঁতে পারে না!?...
নিরু ওর বাহুদুটো আমার কাঁধে রেখে হাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে বলল
- সত্যিই কী তাই...! তারপর আমার চোখে চোখ রাখল ... আমি যেন পুড়ে যেতে লাগলাম...
সেদিন নিরুর ঠোঁট আমার ঠোঁটে মাউথঅরগানের থেকে ভালো সুর তুলেছিল...
“After all the dust has settled, we can settle down Just the two of us forever, no one else around No one else around around, around...”
সাক্ষী শুধু ইচ্ছে গাছ...
ক্রমশ

সেরা পোস্ট

সেই রাতটা! (পুরো গল্প) শোভন নস্কর

- হ্যালো? সমীর ? বল ভাই কেমন আছিস? ফোনেই পাওয়া যায় না তোকে ! - হ্যাঁ এখন একটু ব্যস্ত থাকি আজকাল । বাবা ব্যবসায় ঢুকিয়ে দিয়েছে । - ভালো ...