১৪ ই নভেম্বর।ক্যালেন্ডারে ডেটটা খুঁজলে দেখা যায়,লেখা আছে "চিলড্রেন্স ডে" বা চাচা নেহেরুর জন্মদিন।২০১২ সাল পর্যন্তও ভারতের আম-আদমির কাছে আজকের দুপুরটা ছিল শীতের রোদ্দুর গায়ে মেখে কর্মব্যস্ততার মধ্যে কাটিয়ে দেওয়া আরো একটা বোরিং দুপুর।২০১৩ তে এসে কেমন জানি সব পাল্টে গেল।চারিদিকে কেমন যেন একটা ছুটি ছুটি আমেজ,তবুও লোকজনের চোখেমুখে একটা পরম আত্মীয় বিয়োগের দুঃখ,কেমন যেন একটা অবিশ্বাসের চাহনি---মানে,সত্যিই এটা কোনোদিন হতে পারে?তারা তখনও কঠিন বাস্তবটাকে হজম করে উঠতে পারেননি।অবিশ্বাসের সাথে একটা গভীর শোক যেন দলা পাকিয়ে গলার কাছে আটকে আছে।
আচ্ছা,এই যে এতগুলো লোক তখনও বাস্তবটাকে অবিশ্বাস করছিলেন,দোষ কি তাদের?না।দোষ ওই ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির ৪০ বছরের লোকটার।হ্যাঁ,ওই বেঁটে লোকটাই যত নষ্টের গোড়া।ওই লোকটাই তো গত ২৪ বছর ধরে এতগুলো মানুষের মধ্যে বদঅভ্যাসগুলো নেশার মতো ঢুকিয়ে দিয়েছেন।কেমন বদঅভ্যাস?
এই যেমন ধরুন,একটা বছর বারো-চোদ্দর কিশোর বলা নেই কওয়া নেই টিউশন পড়তে গেলো না,কারণ,ওই বেঁটে লোকটা যে তখন টিভির পর্দায় ওলংগাকে উলঙ্গ করছেন।
কিংবা,একটা মধ্যবয়স্ক ছাপোষা কেরানি হটাৎ করে সকাল ১০ টায় বসকে ফোন করে বললেন,"স্যার,আজ পেটটা ঠিক নেই,অফিস যেতে পারবো না।"আদতে কিন্তু তিনি পুরো ফিট।তাহলে এমন ছেলেমানুষির কারণ?কে আবার?ওই একদা সারদাশ্রমের বিস্ময় বালকটা---ওই যে তখন সে সংযমীভাবে সিডনিতে কাঙারুদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে।
অথবা,ওই যে ক্লাস ইলেভেনের ছেলেটা টিফিন পিরিয়ডে স্কুল থেকে পালালো।কেন?আরে বাবা,তখন তো কোঁকড়ানো চুলের মারাঠিটা চেন্নাইয়ের চিপকে পাকিস্তানের জাদুকর সাকলিনের কালজাদু থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য কোমরে বেল্ট বেঁধেও দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাচ্ছে।
আচ্ছা,ওই বছর পঞ্চাশের লোকটা ১৯৯৯ এর ইডেনে মাঠে বোতল ছুড়তে গিয়ে পুলিশের লাঠি খেলেন কেন?আরে,এবারও দায়ী,ওই মারাঠিটা।ওকে যদি পাকিস্তানের শোয়েব অমন ধাক্কা মেরে রান আউট না করে দিত,তাহলে কি আর বছর পঞ্চাশের সুবেশী ভদ্রলোক মাঠে বোতল ছুঁড়তে যেতেন?
আসলে লোকটা ১২০ কোটির শিরায়,ধমনীতে,রক্তে মিশে হৃদয়ের চারটি প্রকোষ্ঠজুড়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।লোকটাকে নিয়ে আবেগটা যেন প্রশ্বাস বায়ু হয়ে উঠেছিল,যা কেউ কখনও ভেবে চিন্তে গ্রহণ করেন না,বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিয়মিতভাবে প্রবেশ করতে থাকে ও জীবনকে জীবিত রাখে।উনিও বাঁচিয়ে রেখেছিলেন আমাদের আবেগকে,ভালোবাসাকে, শৈশবকে,কৈশোরকে...আদপে,আমাদের নিত্যনৈমিত্তিকতায় ভরা প্রতিদিন হেরে যাওয়া জীবনের মধ্যেও একটা একটা ভিন্ন স্বাদের জীবনকে।
সেই প্রাণটা আজ থেকে বছর চারেক আগেই ওয়ানখেড়ে থেকে দেহত্যাগ করলো,পড়ে রইলো ক্রিকেটের শবদেহ,আবেগের কফিন।

No comments:
Post a Comment