Sunday, 1 October 2017

ঘটিগরম - মনোতোষ বিশ্বাস


"দাদা, ঘটিগরম কত করে?"
"৫ টাকা স্যার। কটা দেব?
"২ টি দিন।ভালো করে বানাবেন কিন্তু।
" হ্যাঁ স্যার আপনি চিন্তা করবেন না। একদম স্পেশাল ঘটি গরম।একটু মুখে দিয়েই দেখুন না।"--বলে ভদ্রলোকের দিকে একটু ঘটি গরম বাড়িয়ে দেয় ঘটিগরম বিক্রেতা।
"বাহ! দারুন হয়েছে দাদা।"-বলেন ভদ্রলোক।
ঘটিগরম বানিয়ে এগিয়ে দেন ঘটিগরম বিক্রেতা।ভদ্রলোক টাকা মিটিয়ে চলে যান গন্তব্যের দিকে।
ঘটিগরম বিক্রেতা রতন দাস। অভাবের সংসার। একমাত্র ছেলে তরুণ,স্ত্রী রমা আর বিধবা মাকে নিয়ে অভাবের সংসার।ছোটবেলাতেই বাবা মারা যাওয়ায় সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছে সেই পনেরো বছর বয়সে।তখন থেকেই বাবার ঘটিগরম বিক্রির কাজ সে নিজে নিয়েছে।
পড়াশুনার সদিচ্ছা থাকলেও অর্থাভাবে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই যেকোনো উপায়ে তরুনের পড়াশুনা চালিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর রতন।তাই রোদ-ঝড় -জল-বৃষ্টি-সব বাধা পেরিয়ে প্রতিদিন সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ে সে।কাঁধে ঘটিগরমের সরঞ্জাম আর হাতে একটা ঝুনঝুনি।
এই গরমেও বিশ্রাম নেই রতনের।এখন গঙ্গার ধারে পার্কটায় গেলে একটু ভালো বিক্রি হতে পারে। তাই পার্কের দিকে এগিয়ে চলে রতন। গত মাসেই মায়ের বড়সড় অপারেশন হয়েছে।অনেকটা টাকা খরচও হয়েছে।এছাড়াও তরুনের কলেজের মাইনে,টিউশন ফি।;আরো কত খরচ! তবুও ক্লান্তিহীন রতন।চোখে হাজারো স্বপ্ন -ছেলে চাকরি করবে,অনেক বড় হবে।
"কাকু,পাঁচটা ঘটিগরম দিন তো"-অর্ডার দেয় একদল স্কুল পালানো ছাত্র।
"এই নাও।"ঘটিগরম বানিয়ে রতন তুলে দেয় ছেলেগুলোর হাতে।
পার্কে আজ বেশ ভিড়। ভালোই হলো। সকালেই তরুণ কে এক হাজার টাকা দিতে হয়েছে কলেজের কি একটা প্রয়োজনে। তাই হাতে বেশি টাকাও ছিলোনা।
পার্কে আরো কয়েক ঠোঙা ঘটিগরম বিক্রি হয় রতনের। অন্ধকার নামছে ধীরে ধীরে।এবার রতন ভাবে বাসস্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে যাবে। যাওয়ার পথে রাস্তার ধারের দামি রেস্তোঁরাতে চোখ যায় রতনের। সাত আট জন কমবয়সী যুবক যুবতীর সাথে বসে তার ছেলে তরুণ।সামনে একটা সুন্দর কেক। আজ রতনের জন্মদিন।বাড়িতে রমা পায়েস বানিয়েছিল সেই উপলক্ষ্যে। তাহলে কি তরুণ মিথ্যে বলে এক হাজার টাকা নিয়েছে বাবার কাছ থেকে!
আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে পা বাড়ায় রতন।চোখ ছলছল করে রতনের।ডান হাতে চোখ মুছে নেয়। হার মানা তার চরিত্রে নেই।সামনে এখনো অনেক স্বপ্ন--ছেলে অনেক বড় হবে,চাকরি করবে। দ্রুত এগিয়ে যায় রতন। তিরিশ বছরের ব্যাবসায় অভিজ্ঞ রতন হাঁক দেয় "ঘ..টি..গ...র...ম"। সঙ্গে সঙ্গত করে বাঁ হাতের ঝুনঝুনিটা।

No comments:

Post a Comment

সেরা পোস্ট

সেই রাতটা! (পুরো গল্প) শোভন নস্কর

- হ্যালো? সমীর ? বল ভাই কেমন আছিস? ফোনেই পাওয়া যায় না তোকে ! - হ্যাঁ এখন একটু ব্যস্ত থাকি আজকাল । বাবা ব্যবসায় ঢুকিয়ে দিয়েছে । - ভালো ...