Monday, 30 October 2017

রোদের গন্ধ -সৌভিক ঘোষ


 ১৯৯৬-এর ব্যাঙ্গালোর। বিশ্বকাপের জন্য ভারতীয় দলের কন্ডিশনিং ক্যাম্প চলছে চিন্নস্বামীতে। ক্যাপ্টেন আজহার , ম্যানেজার ওয়াদেকর । দুর্দান্ত প্রতিশ্রুতিমান বিক্রম রাঠোরের রুমমেট ব্যাঙ্গালোরেরই স্থানীয় একটি মুখচোরা ছেলে। ঘরোয়া ক্রিকেটে বিস্তর রান-টান করেছে কিন্তু কেন জানিনা প্রচারের আলোর বাইরে। 
  কন্ডিশনিং ক্যাম্পের শেষ দিন। দল ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। সবাইকে অবাক করে বিক্রম রাঠোর বাদ। ইন্ডিয়া মিডিয়াও বিমূঢ়। রাঠোর তখন পিন আপ হিরো। এক প্রখ্যাত ইংরেজি দৈনিকের সাংবাদিক রাঠোরের ঘরে গিয়ে দেখলেন ঘর কার্যত শ্মশান। ছলছলে চোখে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দেওয়ালের দিকে। আর তাঁর স্বল্পভাষী রুম মেট নির্লিপ্ত মুখ করে ব্যাগ গোছাচ্ছেন , স্থানীয় ছেলে আজই ফিরে যাবেন বাড়ি। এই প্রথম ফিল্ডিংয়ে গ্যাপ পেলেন সাংবাদিক। ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন , " তোমার প্রতিক্রিয়া কি?"
অদ্ভুত উত্তর দিল ছেলেটি , "হিসেব করে দেখলাম ইংল্যান্ড ট্যুরের আগে চারটি রঞ্জি ম্যাচ আছে। চারটি সেঞ্চুরি করতে হবে আমায়।" বলেই ব্যাগ নিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল ছেলেটি।

   ওয়াদেকর-আজহারের কাজিয়ায় প্রত্যাশার বেলুন চুপসে গিয়ে সেবার বিশ্বকাপের সেমিতেই বিদায় নিয়েছিল ভারত কিন্তু কথা রেখেছিল ছেলেটি। চারটে রঞ্জি সেন্চুরীতে ভর করে ইংল্যান্ড সফর। ওভারকাস্ট সিচুয়েশন ও দুর্দান্ত ইংল্যান্ড বোলিংয়ের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্টেই ৯৬ জানান দিয়েছিল এক মহাতারকার আগমনী গানের। আর ফিরে তাকাতে হয়নি। ব্যাঙ্গালোরের মুখচোরা ছেলেটিই ১৭ বছর বুক দিয়ে আগলেছিল ভারতীয় ব্যাটিং স্তম্ভ , হয়ে উঠেছিল মানুষ থেকে  আস্থার দেওয়াল।

২০১১- এর ২ রা এপ্রিল , আতশবাজির ওয়ানখেড়েতে ধোনি যখন বিশ্বকাপ নিচ্ছেন শারদ পাওয়ারের কাছ থেকে তখন কয়েক শত মাইল দূরে রাহুল শারদ দ্রাবিড় ব্যস্ত রাজস্থান রয়ালের প্রস্তুতিতে। নীরবে।অথচ সাফল্যের হাইওয়ে তৈরিতে ভূমিকা তো তারও কম ছিল না। পরিসংখ্যান দেখলে দ্রাবিড়ও তো খারাপ ক্যাপ্টেন নন । ওয়েস্ট ইন্ডিসে জিতেছেন , পাকিস্তানে জিতেছেন , ওয়ান ডে তে যথেষ্ট ভালো পরিসংখ্যান ক্যাপ্টেন হিসেবে। নেহাত চ্যাপেল রাজের কানাগলিতে না হারিয়ে গেলে কে বলতে পারতো তাঁর নামেই এই গৌরবগাঁথা লেখা হতো না ! 
সম্ভবত টাইমস নাউ থেকে স্টুডিও লাইভে দ্রাবিড়কে ধরা হয় ২ রা এপ্রিলের রাতে , প্রশ্ন করা হয় তাঁর আফসোস আছে কিনা মাত্র চার বছর আগের অধিনায়ক হিসেবে । উত্তরও আসে দ্রাবিড়চিত পুলে - "অন্যের সাফল্যে চোখ টাটিয়ে কি লাভ ? যেটা আমি করতে পারি সেটা আগামীকাল সকালে ঠিক নটায় প্র্যাকটিসে হাজির হতে ।"
   বাকিটা ইতিহাস। বিশ্বকাপ জয়ের ঠিক পরেই ইংল্যান্ড সফরে ৪-০ টেস্ট সিরিজ হারে ধোনির ভারত। সিরিজে তিনটে সেঞ্চুরি করেন রাহুল শারদ দ্রাবিড়।
  স্বল্পবাক , মিতভাষী লোকটা যদি কোনো দিন মোটিভেশনাল বই লেখেন তাহলেই নিশ্চিতভাবে কৌলিন্য হারাবে 'You Can Win' বা 'What They Didn't Teach You at Harvard' এর মতো বইগুলোও।

১৯৯৬ -এর ২২ শে জুন ক্রিকেটের মক্কা সাক্ষী ছিল এক অন্য মহাতারকার পুনর্জন্মে। যতবার তাঁকে মূল্যায়ন করেছে বিশ্ব ততবার  মনে পড়ছে ঋত্বিক ঘটকের অমর সৃষ্টি ' মেঘে ঢাকা তারা' -এর নাম। সচিন , সৌরভ বা সেওয়াগের প্রতিভার ছটায় তাঁরও সমান্তরাল সাফল্য ঢেকেছে বারবার কিন্তু তিনি ঋদ্ধ হয়েছেন চোয়াল চাপা লড়াই , সাফল্যে আর ভরসার আকাশে।

No comments:

Post a Comment

সেরা পোস্ট

সেই রাতটা! (পুরো গল্প) শোভন নস্কর

- হ্যালো? সমীর ? বল ভাই কেমন আছিস? ফোনেই পাওয়া যায় না তোকে ! - হ্যাঁ এখন একটু ব্যস্ত থাকি আজকাল । বাবা ব্যবসায় ঢুকিয়ে দিয়েছে । - ভালো ...