---"তাড়াহুড়ো করোনা বেশি। আমি এখনই একটু জল ভরে দিচ্ছি বোতলে।গ্লুকোজ মেশানো জল খেলে শরীরটা একটু তাজা লাগবে।"
---"অনেক দেরি হয়ে গেছে।এখন আর দিতে হবে না।ট্রেনটা না মিস করি।" বলেই হন্তদন্ত হয়ে অফিস যাওয়ার জন্য রওনা দেয় অভি।
রাস্তায় বেরিয়ে রিকশা না পেয়ে অভি পা চালায় স্টেশনের দিকে। আজ হয়তো সত্যিই ট্রেনটা মিস করবে। হাজারো কাজের চাপ, দুই বছরের সংসার জীবনে এখনো সন্তান না আসায় মানসিক অশান্তি;তার উপর শরীরটাও ভালো যাচ্ছেনা ।সব মিলিয়ে অভিরমনটা সামুদ্রিক ঝড়ের মতো অশান্ত হয়ে রয়েছে।
"না আজ আর রিকশা পাওয়া যাবেনা।রিকশা ইউনিয়নের সবাই মনে হয় বিশ্বকর্মা পুজোতে ব্যস্ত।"অগত্যা স্টেশন যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা নিতে বাঁ দিকে মোড় নেয় অভি। হঠাৎ বেজে ওঠে ওর সেলফোনটা।
"আবার মনে হয় রাস্কেলটা ফোন করছে।ও কি বোঝেনা আমি ওকে avoid করছি। ফোনটা রিসিভ না করেই আরো দ্রুত পায়ে হাঁটতে থাকে সে।
এই রাস্কেল বলতে অভির একসময়ের খুব কাছের বন্ধু তমাল। পড়াশুনায় অত্যন্ত মেধাবী ছেলেটা হঠাৎ করে সঙ্গদোষে একেবারে গোল্লায় গেছে। মদ,জুয়া এমনকি হেরোইন টাও নাকি আজকাল চলে তার।বছরখানেক দেখা হয়নি ভালোই ছিল। মাস কয়েক হলো কথা থেকে অভির ফোন নম্বর নিয়ে ফোন করছে আর শরীর খারাপের দোহাই দিয়ে টাকা চাইছে ওইসব ছাইপাশ খাবে বলে।অভি কি পাগল নাকি যে ঐ নেশাখোরটাকে টাকা দিয়ে মাথায় তুলবে! একরাশ বিরক্তি নিয়ে আরো জোরে পা চালায় অভি।আর পাঁচ মিনিট বাকি ট্রেনের। কি যে হবে কে জানে! এমন সময় আরো একবার বেজে ওঠে সেলফোনটা। তোয়াক্কা না করে এগিয়ে চলে অভি।
শালার হার্টের সমস্যা না ছাই! শুধু টাকা বাগানোর ধান্দা।ব্যাটা কি করে যে এই পথে পা বাড়ালো... আর ভাবতে পারেনা অভি।
আর একটু এগিয়ে যেতেই ডান দিকের সরু অন্ধকার গলির ভিতর থেকে কে যেন অভিকে ডেকে ওঠে।এই গলিতেই যে এখন তমালরা থাকে সেটা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল সে।তবু থমকে দাঁড়ায়-একটু পিছিয়ে এসে গলির দিকে ঘুরতেই দেখে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসছে সুরজিৎ,বিকাশ আর অম্বরিশ।এখানে ওদের দেখে একটু অবাক হয় অভি।
"কি রে কতক্ষন ধরে ফোন করছি।ধরছিস না কেন?"--বলে বিকাশ।
"হ্যাঁ.. আসলে অফিসে তাড়াহুড়ো করে বেরোচ্ছিলাম তো,তাই।তা তোরে এখানে?"
"কেন তুই কিছু শুনিসনি!"-শোনে অম্বরিশ।
"কি শুনবো!কি হয়েছে খোলস করে বলবি তো।"-অবাক হয়ে প্রশ্ন করে অভি।
"কাল রাতে তমাল মারা গেছে।প্রায় বিনা চিকিৎসাতেই। আমরা সবাই তো বেকার।তবু যতটা পারি করেছিলাম।কিন্তু শেষরক্ষা হলোনা"-বলে সুরজিৎ।
কোনো কথা বলে না অভি।বাড়িতেও কিছু জানায় না। দাহ করা সাঙ্গ হলে ইছামতীর ধরে গিয়ে বসে অভি।সঙ্গে সুরজিৎ,বিকাশ আর অম্বরিশ।সকলেই নির্বাক- অপলক দৃষ্টি। শুধু কথা বলে চলে মৃদু বাতাস,ইছামতীর তীরে সদ্য ফোটা কাশফুল আর ইছামতীর ঢেউ।আরো দূরে পশ্চিমে সূর্যাস্তের রঙিন শোভা দেখতে দেখতে অভির মনে হয়-আরও একজন হয়তো নিঃশব্দে তাদের সাথে বসে আছে--------অনেকদিন পর------আরো একবার------সবাই একসাথে।।

No comments:
Post a Comment