আমার ইচ্ছে গাছ... আমার আর নিরুর... নাহ... ওকে নিরু ডাকার অধিকার আমি নিজেকে আর দিতে পারছি না... নিরুপমার ইচ্ছে গাছ... যতদূর বাজ পড়েছে নাকি কোন ক্ষয় অসুখ ধরেছিল জানিনা... অভিমানের মত কালো স্তুপ হয়ে পড়ে আছে... নিরুপমাদের বাড়িটার দশাও তথৈবচ। নিরুপমার বাবা মারা গেছে... মা বলছিল... আর মনে হয় নিরুপমাও কথাও চলে গেছে।
নিরুপমা, তুমি কি আমার জন্য অপেক্ষা করেছিলে...? কতদিন...? ভাগ্যিস বেশিদিন নয় ... আমি তোমার সামনে আসতে পারতাম না... কীভাবে বলতাম যে আমি মনে রাখতে পারিনি... ধরে রাখতে পারিনি।
সুতরাং মনটা তেতো হয়ে রইল।
**************************************************************************************
কয়েকদিনের মধ্যেই আমি ব্যাবসা বুঝে নিলাম... লাভও হতে লাগল... আর আমি নিরুপমাদের বাড়িটা কিনে নিলাম... ওদের জায়গা সমেত।
অবচেতনে এই কাজটা করার ইচ্ছা আমার বহুদিন ছিল... ইচ্ছে হত এই বাড়ি কিনে নিয়ে ওর ওই মাতাল বাপকে গলা ধাক্কা দিয়ে বার করে দেব, সব নিরুর জন্য। এখন রাগটা কার উপর বেশি জানি না... নিরুপমার বাবা... নাকি নিরুপমার উপর। নাকি রাগের চাদরে আমি নিজের অপারগ মুখটা ঢাকতে চাইছি।
ইতিমধ্যে কায়ার সাথেও আমার বনিবনা হচ্ছিল না। জেনেবুঝে আমারা দুজনেই ঝাঁপটা দিয়েছিলাম... পস্তাচ্ছিলাম দুজনেই। কিন্তু কায়া রীতিমত আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে... ওকে দোষ দেব না। আমি তো আমার জায়গাতেই ।। কিন্তু ও সব ছেড়ে... বন্ধুবান্ধব চেনা জায়গা...বাবা মা... তারওপর প্রেগন্যান্সি।
ও যেসবের মধ্যে বড় হয়েছে তার কোন সুবিধাই এই গ্রামে নেই... প্রেমের চাদরটা সরে যাবার পর ও ওর ভুলটা বুঝতে পারছে।ক্রমাগত বলে চলেছে যে ওর জীবনটা শেষ হয়ে গেল তার জন্য আমি দায়ি...
মা বললেন বাচ্ছা মেয়ে... প্রথমবার বাচ্ছা হচ্ছে নতুন জায়গায় মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে... তাই আমি কিছুদিনের জন্য ওকে শহরে ওর মা বাবার কাছে পাঠিয়ে দিলাম...
নাহ্ ! কায়াই এখন আমার জীবন আমাদের ভবিষ্যৎ ... ওকে আমি ভালবাসি... কথটা মনে মনে একটু জোর দিয়েই বললাম... একটা পরিকল্পনা ছিল আমার...
নিরুপমাদের বাড়িটা রেনভেসান করে আমি ওখানে ওকে শহরের সব সুবিধা এনে দেব... ওর ছোট্ট দুনিয়া তৈরি করে দেব। বাবা মা ও আমার এই চিন্তায় একমত হলেন... সম্পত্তি ফেলে রেখে ঘুন ধরানো তো উচিৎ না।
যথারীতি কাজ শুরু হয়ে গেল...
মাঝখানের বেড়াটা উপড়ে ফেলা হবে... ইচ্ছে গাছটাও।
গাছটাকে কাটতে খুব একটা বেগ পেতে হল না... কিন্তু এর শিকড় যে বহুদুর গেছে... অনেক গভীরে। শিকড়কে কি উপড়ে ফেলা অত সহজ... আমি বসে লোকগুলোকে কসরত করতে দেখছিলাম...
- দাদা!! একবার জলদি একটু এদিকে আসবেন... হঠাৎ যেন একটু জটলা বেঁধে গেল ওই দিকটাতে...
- হ্যাঁ?! কী হয়েছে... উপড়াচ্ছে না ? বলতে বলতে আমি এগলাম
কাছে গিয়ে যা দেখলাম... আমার মাথা ঘুরে গেল...
***************************************************************************************
কঙ্কাল... একটা ৫/৭ বছরের বাচ্চার কঙ্কাল...
তারপরে থানা পুলিশ... যদিও আমাদের সেসব ঝক্কি পোহাতে হয়নি... সেসব বাবাই দেখে নিয়েছেন...
পুলিশ জানাল কঙ্কালটা একটা বছর পাঁচেকের মেয়ের কঙ্কাল ... খুব একটা নতুন না... খুব বেশি হলে বছর ২০ আগেকার... মৃত্যুর কারন শ্বাসরোধ বা সাডেন নেক ইনজুরি... অর্থাৎ ঘাড় ভেঙ্গে মৃত্যু...
আমার কিছু ভাবতেই ভয় করছিল... তার আগেই মা কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে বলে উঠলো ...
- আমি তোমাকে বলেছিলাম না মেয়েটাকে জানোয়ারটা শেষ করে দিয়েছে... সেই রাতে ওরকম চিৎকার চেঁচামেচির পর থেকে আমি আর কোনদিন মেয়েটাকে দেখনি... বলে কিনা মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে ... ওই ইতরতাই মেয়েটাকে খুন করে গাছের নীচে পুঁতে দিয়েছিল... আমি কেন কেউই তো কোনদিন আর দেখতে পায়নি মেয়েটাকে... আমি বলেছিলাম!!... মা কেঁদেই চলল
আমার মাথাটার মধ্যে যেন কেউ কপ্পুর ঠুসে দিয়েছে...
বলতে গেলাম – আমি দেখেছি... আমার নিরু... ওকে আমি বহুদিন চিনতাম... ৫ বছর! এ কিকরে সম্ভব! আমি তো সাতের নিরুর সাথে দোল খেয়েছি ওই গাছের ডালে... ১৩র নিরুর সাথে গান শুনেছি ...১৮র নিরুকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছিলাম যে আমি ফিরে আসব... তবে...
তবে এর একটা কথাও আমার মুখ দিয়ে বেরল না... আস্তে আস্তে হেঁটে নিরুর বাড়িতে ঢুকলাম... যদিও বাড়িটা এখন আমার আর কায়ার বাড়ি।
পুরো বাড়িটার ভোলই বদলে গেছে... মারবেলের মেঝে... আধুনিক আলো... সুদৃশ্য কীচেন... আর কায়ার পছন্দের পিয়ানো।
পিয়ানোর সামনের টুলটায় বসে লিডটা ওঠালাম... আর তক্ষুনি পিছন থেকে দুটো হাত আমার চোখ চেপে ধরল...
***************************************************************************************
চমকে পিছনে ঘুরে দেখলাম কায়া হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে... ওকে অপূর্ব লাগছিলো... লাবণ্য ঠিকরে পড়ছে... হাঁপ ছাড়লাম ...
- একী তুমি!! ভয় পাইয়ে দিলে তো...
- এইমাত্র এলাম... একাই...
- তুমি... এভাবে একা... কেন? আমাকে খবর দিলে না...
- না নাহ্... ডাক্তার বলেছে আমি একদম ফিট... তার উপর তোমাকে না দেখে এতদিন থেকেছি কখনো? কায়া ঝলমলিয়ে হাসল...
- হুম্... হবু মায়ের তো নিজের মায়ের যত্ন পেয়ে দেকছি গ্লামার একেবারে ঠিকরে পড়ছে...
কায়া যেন কথাটা গায়েই মাখল না...
- চল ওঠ... তোমাকে কিছু বাজিয়ে শোনাই...
- আরে সেসব পরে হবে ... আগে বিশ্রাম...
- না এখনই... কায়া বসে পড়ল... আঙুলগুলো একবার পিয়ানোয় বুলিয়ে নিল...
আর তারপরে প্রত্যেকটা সুরকলি যেন ও পিয়ানোর কী তে না ... আমার পাঁজরে বাজাচ্ছিল...
“ওগো নিরুপমা করিও ক্ষমা
তোমাকে আমার ঘরনি করিতে
আমার মনের দোসর করিতে পারিলামনা
পারিলামনা তো কিছুতেই...”
আমার মেরুদণ্ড দিয়ে যেন কোন সরীসৃপ উপর নীচ করতে লাগল... বুকে হাতুড়ী পিটছিল...
-এই গানটা... কায়া?
-কারন গানটা আমাকে নিয়ে লেখা!! ভুলে গেলে বুঝি...? কায়া হাসল...
-হ্যাঁ নিরুপমা হ্যাঁ!! আমি ভুলে গেছিলাম... আমাকে ক্ষমা করে দাও নিরু... আমি কথা রাখতে পারিনি... আমি শুধু তোমাকে ভালবাসি... আমি সেই ১৩ বছরের ছেলেটার মত কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম... যে বলেছিল নিরুপমাকে এসবের থেকে বহুদুরে নিয়ে যাবে ...
-কে বলল তুমি কথা রাখনি... নিরুপমা সেই আগের মত আমার গলা জড়িয়ে ধরল ...
তুমি বলেছিলে আমাকে মুক্তি দেবে... দিয়েছ... ইচ্ছে গাছের সাথে আমি আর বাঁধা নেই... আমি মুক্ত...আমিও আমার কথা রেখেছি... এখন আর আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না ...
-না ! কেউ পারবে না... আমি কায়ার... নাহ্ নিরুর হাতদুটো চেপে ধরলাম...

No comments:
Post a Comment