Thursday, 28 September 2017

গরুচোরের সন্ধানে শেষ পর্ব- শোভন নস্কর


-স্যর, ঝাউডাঙায় আবার-

-বলিস কি? কনস্টেবল দুটো করছিল কি? ডেকে আন তো ব্যাটা দুটো কে!
             দুজন   ঘরে এসে মুখ কাঁচুমাচু করে বসে থাকলবকাঝকা দিয়ে কোন লাভ হল না! বলল, ওরা নাকি ঘুমিয়ে পড়েছিল, সেই ফাঁকেই-
সবকটা ফাঁকিবাজ এদের দিয়ে কিস্যু হবে না।যা করতে হবে এবার নিজেকেই করতে হবে।
      সুতরাং সদানন্দকে নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম । পুজোর সময় কিন্তু কাল থেকে বৃষ্টি নেমেছে। বিরক্তিকর। ঘন কালো মেঘে আকাশ ভর্তি। রাস্তায় গাড়ি মাঝে মাঝেই জল কাদায় পড়ছে।পথে যেতে বিএসএফ ক্যাম্পটাও দেখি কেমন যেন থমথমে ভাব ।চারিপাশে আর সবুজের সমারোহ নেই ।বিশাল গাছ গুলোকে  মনে হচ্ছিল পাহাড়ের মতন, বর্ষার অস্পষ্ট পরিবেশের মধ্যে দিয়ে যেন কোন পাতালপুরীতে চলেছি।
      গ্রামে যখন পৌঁছলাম তখন আমাদের গাড়িটা দেখে হইচই শুরু হয়ে গেছে।কয়েকটা অর্ধনগ্ন বাচ্চা ছুটে আসলো গাড়ির পিছন পিছন। সব কর্দমাক্ত।আশেপাশে যারা ছিল তাদের দেখে মনে হল না তারা আমাদের ওপর খুব প্রসন্ন হয়েছে।নরহরিকে জিজ্ঞেস করলাম পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ি কথায়?  নরহরি আঙুল দেখিয়ে নির্দেশ করল ।
     সে রাস্তায় গাড়ি নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। আমি আর সদানন্দ ছাতা মাথায় দিয়ে কাদার উপর দিয়ে যেতে লাগলাম। সরু রাস্তা । বাড়ির আশেপাশে লম্বা লম্বা তাল আর নারকেল গাছে ভর্তি । দুতলা বাড়ি নয় কিন্তু গ্রামের হিসাবে বড় বাড়িই বলতে হবে। আমাদের দেখেই হারিকেন হাতে এগিয়ে এলেন রতনবাবু। গ্রামে বিদ্যুৎ থাকলেও বৃষ্টি হলেই লোডশেডিং।
-আরে স্যর। কি সৌভাগ্য আসুন আসুন।    বলে দন্ত বিকশিত করে বসতে বললেন। ভুঁড়িওয়ালা মোটা গোঁফ, বয়স পঞ্চাশ লোক হবে। বাইরে তখন বৃষ্টি বেড়েছে। সন্ধ্যা হব হব ভাব। ছাতা বন্ধ করে চেয়ারে বসলাম। টেবিলে হারিকেনটা জ্বলছে। সদানন্দ পাশে দাড়িয়ে।
-কি ব্যাপার? আপনার এলাকায় বার বার গরু চুরি হচ্ছে। আপনার যে কোন হেলদোল নেই মশাই!
ভুরু কুঁচকে রতন বিশ্বাস বলল, কি বলছেন স্যর! আমি ভীষণ চিন্তিত-
-আপনার তো দেখে তা মনে হয় না মশাই।আমদের সাথে যা যোগাযোগ করার সব তো ঐ নরহরি-
-আরে রাখুন ত!নরহরির একটু বেশি চিন্তা! গ্রামে অমন দু একটা চুরিচামারি হয়। আরে বর্ডার এলাকা বলে কথা !
-তাই কি!
ইতিমধ্যে কোত্থেকে চা আর সিঙ্গারা নিয়ে হাজির রতনবাবুর স্ত্রী । দুজনে লোভ সামলাতে না পেরে কামড় বসালাম।রতন বাবু হেসে বললেন , খান স্যর। লাগলে বলবেন ।
চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, রতনবাবু ওই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পিচের রাস্তাটা করলেন কেন?
যেন কিছুই বোঝেননা এমন ভাবে উত্তর দিলেন , আরে স্যর গ্রামের বাচ্চারা স্কুল যায় ওই রাস্তা দিয়ে কত সুবিধা হল বলুন তো।
-গ্রামের ভিতরের রাস্তা কাঁচা । এই বর্ষায় কাদায় ভর্তি আর আপনি স্কুল দেখাচ্ছেন।
-স্যর গ্রামেও হয়ে যাবে , পরের বছর টাকাটা হাতে পেলে-
-থামুন । কিছু বুঝিনা ভাবছেন?লজ্জা হওয়া উচিৎ আপনার।যারা আপনাকে ভোট দিয়ে জিতিয়েছে তাদের এভাবে সব্বনাশ করছেন। বলি , কতটাকা পান?
-মা-মানে?
-মানে কিছুনা একদিন রাতে তুলে নিয়ে গিয়ে লকআপে এমন মার দেব সারাজীবন মনে রাখবেন। আপনার কোনো পার্টির নেতা অবধি টু শব্দ পাবে না।সকালবেলায় ঠিক টাইমে বাড়ি পৌঁছে দেব । যাবেন নাকি?
লোকটা ইতস্তত করতে লাগল। কাঁদবেন না রাগবেন বুঝে উঠতে পারছেন না!
-না-না! আমি কিচ্ছু জানি না স্যর সত্যি বলছি ।
-নাহ আপনি সত্যিটা বলছেন না।আপনাকে তবে নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছি ।    বলে যেই হাতটা ধরলাম বেচারার অবস্থা কাঁদো কাঁদোহাত ছাড়িয়ে বলল, বলছি বলছি স্যর, কোথাও নিয়ে যাবেন না!
চেয়ারে আবার বসে সিগারেটটা ধরালাম ।রতন বাবুর মুখ নিচের দিকে।হারিকেনের আলোয় মুখের অর্ধেকটা দৃশ্যমান ।
-এবার ঝেড়ে কাশুন তো মশাই, অনেক হয়েছে ।
রতনবাবু বলা শুরু করলেন, আপনি তো নিশ্চয় জানেন পুরো বনগাঁ থেকে এতদূর পর্যন্ত চোরা ব্যবসায়ীদের একটা জাল বিছানো রয়েছে! চার পাঁচজন হল এর মাথা। মন্ত্রী থেকে শুরু করে পাড়ার গুণ্ডা অবধি সবই এদের হাতে রয়েছে।পঞ্চায়েত-প্রধান হয়ে জেতার সাথে সাথেই ওই জায়গায় রাস্তা তৈরির চাপ আসতে থাকে । টাকাও আসে । বিশ্বাস করুন আমি চাইনি এসব করতে কিন্তু দলের কথায় করতে বাধ্য । এদিকে ব্যবসা সামলায় বিশু মল্লিক । নাম শুনেছেন নিশ্চয় ।ভীষণ প্রতিপত্তি । তার গায়ে একটা আঁচড়ও লাগাতে পারবেন না। হাত দিয়েছেন তো মরেছেন। সবই তার হাতে ।কিন্তু অন্য ব্যবসায়ীদের তুলনায় এই লোক অত্যন্ত নিকৃষ্ট যাকে বলে ।বাইরে থেকে একবার গরু আনতে গিয়ে গাড়ি নাকি অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যায় । ড্রাইবার , দুই খালাসি আর গোটা দশেক গরু ব্রিজ ভেঙে সোজা জলে । ক্ষতিপূরণের জন্য ওই অসভ্য লোকটা গ্রামের লোকেদের গরু চুরি করা শুরু করেছে । কিন্তু চারটে গরুচুরির পর আর সে চুরি করেনি। সে আমাকে বলেছিল। কিন্তু তারপরও চুরি হচ্ছে। আমার সন্দেহ এগুলো ছিঁচকে চোরের কাজবিশুর দেখানো পথেই তারা সাহস পেয়ে গেছে ।

     সিগারেটটা শেষ করলাম!বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে । সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সদানন্দকে বললাম , টর্চটা এনেছিস রে?
-হ্যাঁ স্যর ।
-বউকে ফোন করে দে যে আজ রাত্রে আর বাড়ি ফিরছিস না।
-স্যর প্লিজ।কাল মেয়ের জন্মদিন। অনেক কাজ বাড়িতে-
-মেলা ফ্যাচ ফ্যাচ করিস নাতো! কি জন্য এই চাকরী করতে এসেছিলি?
সদানন্দ বকা শুনে চুপ মেরে গেল!

       রাত এগারোটায় জঙ্গলের মধ্যে জিপটায় বসলাম ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার । আকাশ পরিষ্কার হয়েছে। তবু চারিদিক ভেজা ভেজা। সোঁদা গন্ধ । চাঁদ তখনো ওঠেনি । জোনাকির আলো তখন সেই নিস্তব্ধ নরকের অন্ধকার ভাঙ্গার ব্যর্থ প্রয়াস করছে ।আজ রাতে কিছুই হয়ত হবে না তবে জেদ চেপে বসল। একটু আগে নরহরির বাড়ি থেকে ভাত খেয়ে এসেছি ।সদানন্দকে একটু ভয় পাইয়ে বললাম, জানিস তো এইসব ছিঁচকে চোরদের হাতে কিন্তু ভোজালি রামদা থাকে।
-অ-অত ভা-ভাববেন না স্যর। আমাদের তো পিস্তল আছে ।
হেসে উঠলাম। সে হাসি সদানন্দর ঠিক পছন্দ হল না। বসে বসে মশা মারতে লাগলো ।
       রাত আড়াইটে। সারাদিনের খাটুনির পর ক্লান্তিতে ঝিমচ্ছিআকাশে তখন ঝলমলে চাঁদ । বড় বড় গাছের মাথা গুলো বরফের ন্যয় শুভ্রগাছের ফাঁক দিয়ে রৌদ্রের মত চাঁদের আলো এসে পড়েছে জিপে । একটু তন্দ্রা যেতেই ধাক্কা দিল সদানন্দ । চমকে তার মুখের দিকে তাকালাম সে মুখে আঙ্গুল তুলে আমাকে চুপ করতে বলল ।তারপর একটা আঙুল তুলে সামনের দিকে দেখাল । বাইরে দেখি একটা সাদা গরু হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে । পাশে একটা আলো মতন । নড়ছে । মনে হয় চোরটা হাতে লন্ঠন নিয়ে নিয়ে এসেছে ! আজ তোকে ব্যাটা ছাড়ছি না! সশব্দে জিপ থেকে বার হলাম হাতে পিস্তলটা নিয়ে । ছুটে বেরিয়ে আসতে যাবো এমন সময় সদানন্দ হাত চেপে ধরে, না স্যর যাবেন না ওদিকে !
বিরক্ত হয়ে বললাম ‘রাখতো!’। জোরে ওইদিকে ছুটতে লাগলাম। তারপর কাছে গিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার রক্ত হিম হওয়ার জোগাড় ! পরিষ্কার চাঁদের আলোয় দেখতে পেলাম গরুটা আপন মনে চলছে । আর তার গলার দড়িটা এর এক মাথা সেই আলোটার সাথে রয়েছে । অদ্ভুত নীলচে এক আলো । তার কোন জ্যোতি নেই । দুলতে দুলতে গরুটাকে সে ধরে নিয়ে চলেছে ! যুক্তিবাদী মনটা তীব্রভাবে নাড়া দিয়ে উঠল। একি দেখছি আমি ! স্বপ্ন দেখছি নাতো! মন মানতে চাইলো না!  পিস্তল দিয়ে গুলি ছুঁড়লাম । চেঁচিয়ে উঠে বললাম, কে তুই ? এরপর যা দেখলাম সেটা অন্য কেউ দেখলে জীবিত থাকত পারতো না ! আলোটার আকার ক্রমশঃ বড় হতে লাগল মানুষের মতন। তারমধ্যে এক বীভৎস এক রক্তমাখা মুখ ।অদ্ভুত আওয়াজ করে বলতে লাগল ‘আমরা গো বাবু । বিশু মল্লিকের গরু আনার লোক । ব্রিজ থেকে পড়ে জলে ডুবে মরেছিলাম গো! এখন যখন ক্ষিদে পায় তখন শুধু গরু খাই আর কিচ্ছু ভাল লাগে না । এ কেমন শাস্তি বলুন তো, এ কেমন শাস্তি !’    আশপাশ থেকে কয়েকটা কান্নার রোল ভেসে এলো । সবাই বলতে লাগল, এ কেমন শাস্তি ! এ কেমন শাস্তি !       তারপর সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল গরুটার উপর । চোখের নিমেষেই গরুটার রক্ত ছাড়া কিছুই নেই!

      অজ্ঞান হয়ে শুয়েছিলাম। সকালে সদানন্দ উদ্ধার করে। ঘটনাটা রতনবাবু ছাড়া কাউকে বলিনি। পরে নাকি সে বিশু মল্লিককে বলেছিল। বিশু আবার গয়ায় পিণ্ডি ফিন্ডি দিয়েও এসেছিল । নরহরিকে এরপর আর থানায় দেখিনি । তবে এখনো নাকি ওই বাগানে গরুর হাড় পাওয়া যায় মাঝে মধ্যে!

সব ঘটনাটুকু শেষ করার পর আমার দাদা প্রবীর রায়কে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা, যত আজগুবি ঘটনা কি তোমার সাথেই ঘটে?
দাদা হেসে সিগারেটের সুখটান দিয়ে বলল, যারা ক্রাইম নিয়ে ঘাটাঘাটি করে তাদের সবার সাথেই এমন হয় রে। কিন্তু মুখ ফুটে বললে সবাই হাসবে! তাই আর বলে না !


                                                                  সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

সেরা পোস্ট

সেই রাতটা! (পুরো গল্প) শোভন নস্কর

- হ্যালো? সমীর ? বল ভাই কেমন আছিস? ফোনেই পাওয়া যায় না তোকে ! - হ্যাঁ এখন একটু ব্যস্ত থাকি আজকাল । বাবা ব্যবসায় ঢুকিয়ে দিয়েছে । - ভালো ...