Sunday, 24 September 2017

ইচ্ছে গাছ ৫ / “…জানে আমার প্রথম সবকিছু” আকাশলীনা দে

মনে আছে… নিরুপমার সাথে সেই প্রথম আর শেষবারের মত ঝগড়া করেছিলাম।
- কীরে এতো দেরি করছিস কেন? নীচে সবাই বসে আছেন... বাবা রাগ করছেন তো...
- আমি আসছি মা এক্ষুনি। আমার ২তলার ঘরের জালনা দিয়ে আমি রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি ...
- এখনও কী কেউ আসতে বাকি আছে, যাকে তুমি ডেকেছ? বাবা ঘরে ঢুকলেন...
- না বাবা মানে নি... না মানে আমি একটু নীচ থেকে আসছি... এক্ষুনি চলে আসব...
- ঠিকাছে যাও, তবে ১০ মিনিটের মধ্যে... নিমন্ত্রিতরা সবাই অপেক্ষা করছেন... বাবা চলে গেলেন।
বাবার কথার অবাধ্য হবার মত কোন হাড় আমার শরীরে তখনও গজায়নি, আজও গজায়নি, ভবিষ্যতেও বিশেষ আশা দেখি না... আমি জুতোটা গলিয়ে নিরুর বাড়ির দিকে দৌড় লাগালাম।
বেড়ার ফাঁকটা দিয়ে খুব সাবধানে পার হলাম, নতুন পাঞ্জাবিটা ছিঁড়লে মা আমাকে আর আস্ত রাখবে না...
অনেক নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ত্যাগ করে... অনেক হাত মাথা ঝাঁকিয়ে আমি নিরুর বাড়ির দরজায় একটা টোকা মারার সাহস জোগাড় করলাম... দরজা যেন নিরুই খোলে... ভগবান...
- কে? কী চাই... নিরুর বাবা দরজা খুলল... এই লোকটার প্রতি আমার কিছুমাত্র সম্মান নেই। বিরক্তি আড়াল করে বললাম..
- নিরুপমা আসবেনা?
- কোথায়? নিরুর বাবা একটু অবাক, বিরক্তও... না! নিরুপমা বাড়ি নেই...
- অহ্‌ ... বলে আমি সোজা পিঠ দেখিয়ে দৌড় ওখান থেকে...
স্বাভাবিক যে নিরু ওর বাবাকে নিমন্তন্নের কথা বলেনি... ওই লোকটার সাথে এক বাড়িতে মানুষ থাকে কীভাবে! কেমন মাতাল খুনি চেহারা... ঘরের ভেতরটা ভ্যাপসা পচা গন্ধ... এই বাড়িতে নিরুপমা থাকে! পাঁকে পদ্মফুল ফোটা এর এরথেকে অনেক সোজা কাজ...
কয়েক ঘণ্টা পরে সব নিমন্ত্রিতদের হাসিমুখ দেখিয়ে আমি ওই ভিড় থেকে চুপিচুপি কেটে পড়লাম... এসে বসলাম গাছতলায়... যেটাকে আমার বেশি ঘর বলে মনে হয়... যে জায়গাটা শুধু আমার আর নিরুর ... আর কেউ যেন কাছাকাছিও না আসে।
রাতের অন্ধকারে যেন গাছের নীচটা আলো আলো লাগে...
কোটরে এখন আর বসে পা দোলাতে পারি না... পা মাটিতে ঠেকে যায়... বাবা বলেছে কলেজের পড়া আমি শহরে থেকে পড়ব ... ফিরে এসে ওনার জমজমাটি ব্যাবসার জাঁক আরও বাড়াব... আমার ব্যাবসা ভালো লাগে না... অবশ্য আমার মনে হয় না সেই “ ক্যারিশমা” আমার আছে... যেটা বাবার আছে... আমি শহরে যেতেও চাইনা...
পাঞ্জাবীর পকেট থেকে মাউথঅরগানটা বার করে ঠোট ছোঁয়ালাম
“ Oh my precious ember burning, my sweet glowing light From the moment I first saw you I was yours and you were mine Deep down we both knew you were trouble by design And the echo of my mother's words, "baby don't you play with fire" I was always playing the part first love only set by a spark There was no way changing my mind...”
হঠাৎ ...
- “Now I'm under your spell, trapped in a lie Shouldn't have stood that close to the fire...”
নিরুর গলা... চোখ খুললাম না... রাগটা মাথায় চিড়বিড় করে উঠল এবার... নিরুর বাবার উপর...
- ওই লোকটা তোমায় আসতে দেয়নি না!! আমি জানতাম ! মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম মিথ্যে বলছে... এই দিব্বি দিলাম নিরু ওই লোকটাকে আমি একদিন খুন করে ফেলব... তুমি... তুমি হাসছ...
আমার রাগ আস্তে আস্তে গলে চোখের কোণায় জমা হচ্ছিল... কিন্তু নিরুর ঠোঁটের কোণায় একটা হাল্কা হাসি ছিল...
- বাবা কিছুই জানেন না... আমিই আসিনি...
- মানে! কেন??!! তুমি তো বলেছিলে আসবে... কী ভুল করলাম আমি...
- চুপ কর একটু... নিরুর এই দৃঢ় গলায় আমি বাকি কথাটা গিলে নিলাম...
- একবার দেখো আমার দিকে... আমি কীভাবে যাব তোমার বাড়িতে ? আমি যে কিছু উপহার নিয়ে যাব সেই সঙ্গতি আমার নেই... এইভাবে গিয়ে কাকে কাকে অপমান করব...? বাবাকে... তোমার মা বাবাকে, তোমাকে? নিজেকে!...
নিরু পা মুড়ে ঘাসের উপর বসে পড়ল... মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে... হাঁপাচ্ছিল যেন...
আমি দেখলাম... নিরুর জামাটা বড্ড পুরনো... ওকে আমি অন্য কোন জামায় আর দেখেছি বলে মনে পড়ছে না... কোনদিন খেয়ালও করিনি সত্যি বলতে। আমার সব রাগ দুচোখ বেয়ে নেমে গেল...
আমি ওকে এসব থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাব... এটা ওর প্রাপ্য না... ওর বাবার ওর মত মেয়ে প্রাপ্য না...
আমি নিরুপমাকে কাধ ধরে তুল্লাম...
- আমি তোমাকে এসবের থেকে একদম অনেক দূরে নিয়ে চলে যাব নিরু... তোমাকে মুক্তি দেব... তারপর আমরা একসাথে... কেউ আলাদা করতে পারবে না আমাদের...
- ...
- তুমি আমার সাথে শহরে যাবে...
- কিন্তু আমি যে এখানেই বাঁধা... এখানেই আমার জন্ম... আর এখনেই আমার সবকিছু... তুমি যাও শহরে...
- কিন্তু তুমি? তোমার কী হবে...
- কেন তুমিই যে আমকে মুক্তি দেবে বললে... তুমি ফিরে আসবে... তারপর আমরা সারাজীবন একসাথে ... কথা দিলাম...
নিরুর মুখে হাসি খেলে গেল... এই হাসিকে বর্ণনা করার মত কলম আর ভাষা আছে কিনা আমার জানা নেই...
- এতসবের পরও তুমি কীকরে এতো সরলভাবে হাসো নিরু... তোমার মনটা কী দিয়ে তৈরি? তোমাকে কি কিছুই ছুঁতে পারে না!?...
নিরু ওর বাহুদুটো আমার কাঁধে রেখে হাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে বলল
- সত্যিই কী তাই...! তারপর আমার চোখে চোখ রাখল ... আমি যেন পুড়ে যেতে লাগলাম...
সেদিন নিরুর ঠোঁট আমার ঠোঁটে মাউথঅরগানের থেকে ভালো সুর তুলেছিল...
“After all the dust has settled, we can settle down Just the two of us forever, no one else around No one else around around, around...”
সাক্ষী শুধু ইচ্ছে গাছ...
ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

সেরা পোস্ট

সেই রাতটা! (পুরো গল্প) শোভন নস্কর

- হ্যালো? সমীর ? বল ভাই কেমন আছিস? ফোনেই পাওয়া যায় না তোকে ! - হ্যাঁ এখন একটু ব্যস্ত থাকি আজকাল । বাবা ব্যবসায় ঢুকিয়ে দিয়েছে । - ভালো ...