পত্রিকাটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে দাদা বলল, ছিছি এই গল্প লিখিস তুই!এভাবে লেখক হওয়া তোর কম্ম না! এসব ছাড় আর
মন দিয়ে পড়াশোনা কর।আমি মুখ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। দাদা বলেই চলেছে, এত ভাল একটা তোকে কেসের কাহিনী দিলাম আর তার পিণ্ডি চটকে দিয়েছিস!
আমি কিন্তু গোঁ ধরে বসে আছি।গল্প না নিয়ে যাবই না।গল্প মানে হল
দাদার কিছু রহস্যময় কেস।আগেই তো বলেছিলাম আমার মাসতুতো দাদা পুলিশের এক কর্তা।ছুটি
পেলেই যাই কিছু কেসের খবর শুনতে পরে নানা পত্রিকায় ছেপে দেই।যাইহোক, দাদার বকা শুনেও দূর হলাম না।নির্লজ্জের মতন আরও একদিন পড়েই
থাকলাম।পরদিন সকালে দাদা গম্ভীর-মুখে চা খেতে খেতে বলল,দুটি শর্ত আছে। আনন্দে লাফিয়ে
উঠে বললাম, কি?
-এক তো অবশ্যই তোকে ভাল গল্প লিখতে
হবে। দুই, গল্পের নাম দিতে হবে ‘গরুচোরের সন্ধানে’।
-অ্যাঁ! এ আবার কি জঘন্য নাম! তুমি
কি শেষ অবধি আমাকে গরুচোর ধরার কেস বলবে?!
-দিবি কিনা বল? নয়ত ফোট ।আমার আরও অনেক কাজ আছে।
বাধ্য হয়ে ঢোক গিলেই বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে
ঠিক আছে। বল দেখি ।জম্পেশ রহস্যময় হওয়া চাই কিন্তু।
রোববার ছুটির দিনে দাদা রিল্যাক্সে সিগারেটটা ধরিয়ে আরামকেদারায়
হেলান দিয়ে বলতে লাগল...
আমি তখন বনগাঁ থানায়।দুবছর সেখানে পোস্টিং হয়েই ভাল ভাল কয়েকটা কেস
সলভ করতেই বেশ জনপ্রিয় হলাম আমি।পথেঘাটে লোকজন বেশ সম্মান জানাতো। বনগাঁ বাংলাদেশ
সীমান্তের একটা বড় শহর। কিন্তু ব্ল্যাকের কারবার ঠেকাতে নাজেহাল হতে হত পুলিশের।ধনী
ব্যবসায়ীরা পুলিশ বিএসএফদের কিনে রাতের অন্ধকারে ব্ল্যাকের ব্যবসা করত।প্রথম দিকে
অনেক ধরনের মাল পাচার হত কিন্তু শেষের দিকে গরুটাই বেশি পাচার হত।লাভ ছিল অনেক
বেশি।বাইরে থেকে বড় বড় গরু নিয়ে এসে বাংলাদেশে পাচার করা হত।
পাচার করার জন্য পরিণত মাথার বুদ্ধি ছিল।কিছু কিছু বিএসএফ দের সাথে
চুক্তি থাকত।ব্ল্যাক কারবারিদের তারা একটা টাইম বলে দিত। সেই নির্দিষ্ট সময়ে
পাহারাদার অন্য দিকে যেত।তখন চুপি চুপি কাঁটাতার কেটে রাতের অন্ধকারে নদীতে নেমে
পড়ত।রাতারাতি কিছু আয়ের জন্য গরীব কিছু ছেলে এই কাজ করত।এদের ভাগ্য যে সবসময়
সুপ্রসন্ন হত তা কিন্তু নয়।মাঝে মাঝে বিএসএফদের সাথে মালিকের ঘুষ নিয়ে বচসা হলে বা
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গরু পার না করতে পারলে তাদের খুন করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া
হত।নয়ত প্রচণ্ড মার।কেউ তাদের খোঁজ নিতনা। এমনকি মালিকও না। বলির পাঠা হয়ে যেত
এরাই।রাতের বেলায় আমিও অনেক টহল দিয়েছি ধরার জন্য।কিন্তু কোথায় কি! আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে কোথায় বেড়িয়ে যেত কে জানে!পুলিশের মধ্যেও তো
অনেক দুর্নীতি ।শেষকালে মনে হল হাল ছেড়ে দেই। তখনই একটা অদ্ভুত কেসের সন্ধান পেলাম
বনগাঁর পাশেই একটা ছোট্ট গ্রাম ঝাউডাঙ্গা থেকে।ঘটনাটা গাঁজাখুরি বলে উড়িয়েও দিতে
পারিস তবু আজো ভাবায় আমাকে।সেটাই বলছি শোন ।
তখন জ্যৈষ্ঠমাস।বর্ষার আগের গরমে নাজেহাল অবস্থা।তারওপর গত রাতে
গরু পাচারকারীদের ধরতে গিয়ে সারারাত ঘুম হয়নি।থানায় এসে কাজ করা তো দূরে থাক এসে
ঢুলছিলাম।সদানন্দ ঘোষ তখন হাবিলদার।নিশ্চিন্ত মনে ঝিমচ্ছিলাম হতভাগাটা এসে জাগিয়ে
দিল।হতদন্ত হয়ে এসে বলল, স্যর শুনেছেন ? আমি চমকে উঠে বললাম , কি কি!কি হয়েছে।
-স্যর আবার চুরি!
-কো-কোথায়?
-স্যর ঝাউডাঙায়।
বিরক্ত হয়ে গেলাম।এই গরুপাচার ধরতে ধরতেই আমার পুলিশজীবনে না
কালশিটে পড়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হত গা দিয়েই গরুর গন্ধ বেরুচ্ছে!বললাম, ধ্যাত্তেরি আবার!
-না স্যর এটা অন্য ব্যাপার।গরুপাচার
নয় গরুচুরি।
-বলিস কি হে!
-সত্যি স্যর। বাইরে এসে দেখুন একজন
এসেছে।
বাইরে গেলাম।এসে দেখি এক মধ্যবয়স্ক চাষা বসে আছে।জামা পড়লেও কাঁধে
আবার গামছা।আমাকে দেখেই পা জড়িয়ে ধরল।কেঁদে বলল, বাবু সাহায্য
করুন।নয়ত সব যাবে।
-আ-আচ্ছা ঠিক আছে।হলটা কি?
লোকটা উঠে বলতে লাগল, বাবু বাপের
সূত্রে পাওয়া একবিঘা জমি আছে।ঐ চাষবাস করি আর একখান গরু আছে।মাসখানেক আগে গরুটা
চুরি যায়।অনেক কষ্টে আরেকটা কিনেছি।কাল মাঝরাতে একটু উঠেছি, গোয়ালে গিয়ে দেখি গরুটা নেই।এরমধ্যে আরও কয়েক বাড়ি থেকে গরু চুরি
গেছে। কি করব বাবু বলেন!সবাই গরীব মানুষ। গরু চলে গেলে বাঁচবো কি করে!
গরিব মানুষের অসুবিধা কম মনে থাকে।ইতিমধ্যে মন্ত্রী আসবে এই
ঝামেলায় দুদিন চলে গেল।তারপর একদিন সদানন্দকে বললাম চল তো ঘুরে আসি।বনগাঁ থেকে
একটু বাইরের দিকে গেলেই পড়ে যেত প্রত্যন্ত গ্রাম।জিপে করে সরু পিচের রাস্তা দিয়ে
যেতে লাগলাম। চারিদিকে সবুজ আম জাম গাছের বন কিছুক্ষণের জন্য মনটা হাল্কা করে
দেয়।বাগানের ওদিকটায় নদী।ওটা পার হলেই বাংলাদেশ। মাঝে মাঝে বিএসএফ ক্যাম্প। এমন
পরিবেশে মনটা স্বাভাবিকভাবেই ভাল হয়ে গেল।
গ্রামে ঢুকতেই জলখাবার নিয়ে হাজির সেই মধ্যবয়স্ক চাষী নরহরি ঘোষ ।
মনে হচ্ছিল কোন কেস না বেড়াতে এসেছি।
-বাবু, এই আমাদের ঘর।আর
এ-এই হচ্ছে গোয়াল।দেখুন কেমন শূন্য হয়ে আছে! আপনিই পারেন একমাত্র চোরগুলোকে ধরতে।
কোনরকমে তৈরি পাকা বাড়িটার মাথায় টালি দেওয়া। গোয়ালটা মাটির। কয়েকজন
উঠানে ইতিমধ্যে হাজির হয়েছে ।তাদের কয়েকজন এইসব সমস্যা নিয়েই অভিযোগ করে গেল।
বেরোতে বেরোতেই দুপুর পেড়িয়ে গেল।সদানন্দকে বললাম চল তো চারিপাশটা
দেখে আসি। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে গোয়ালঘরের পিছন টা দেখলাম । বিশাল এক তেঁতুল
গাছ সেখানে।নিচে আগাছার জঙ্গল।একটু এগিয়ে একটা পুকুর দেখতে পেলাম ।কিছু মাছরাঙা
ছাড়া আর কিছুই নজরে এলোনা। একদম নিস্তব্ধ পরিবেশ।জঙ্গলটা পেড়িয়ে যেতেই একটা বড়
পিচের রাস্তা চলে গেছে পাশের বড় জঙ্গলটার ভিতর দিয়ে। সদানন্দ বলল, স্যর, এই রাস্তাটা বেশিদিন হয়নি।এখানকার
পঞ্চায়েতপ্রধানই করেছেন অনেক চেষ্টা করে ।
-এতে কৃতিত্বের কিছু নেই সদানন্দ ।
-কেন স্যর ?
-আরে কখনো ভেবেছ রাস্তাটা কোন দিকে
যাচ্ছে? বর্ডারের পাশে। যাতে নিশ্চিন্তে
ব্ল্যাক করা যায়। এমন ঘুষখোর নেতা তো দেশে এখন ছড়াছড়ি। কেস একদম পরিষ্কার। গ্রাম
থেকে চুরি করে গরু পাচার করে দাও। ডাবল লাভ! তা নাহলে এই ফাঁকা জায়গায় কেন পিচের
রাস্তা করতে যাবে? কিভাবে মানুষকে এরা চুষে খাচ্ছে।
ফেরার পথে নরহরিকে রাস্তার কথা জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল, ওই রাস্তায় বাবু তেমন কারোর যাওয়ার দরকার পড়ে না।শুধু স্কুলে যেতে
মাঝে মাঝে বাচ্চারা ওই রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যায়।
-ঠিক আছে এবার থেকে রাতে দুজন করে
কনস্টেবল থাকবে ওই তেঁতুল গাছের দিকটায় । ওখান থেকে সবটা দেখা যায় পাড়াটার।
কয়েকদিন এভাবে কেটে গেল। তারপর একদিন সদানন্দ এসে বলল, স্যর আবার! ভুরু কুঁচকে
বললাম, মানে?
-স্যর, ঝাউডাঙায় আবার-

No comments:
Post a Comment