Wednesday, 27 September 2017

মহুয়া - শুভদীপ বন্দোপাধ্যায়

সুচিত্রা সেন দর্শকের আসনে উত্তর কলকাতার এক জলসায়।একই মঞ্চে গাইবেন সন্ধ্যা শ্যামল হেমন্ত।সে আমলে এমনি অস্থায়ী স্টেজেও আজকাল যাকে বলে মাচা, স্বনামধন্য শিল্পীরা অংশ নিতেন।
সেখানে মিসেস সেন র সামনে প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে নাচছে একটা সাত বছরের বাচ্চা মেয়ে শিপ্রা।সুচিত্রা মুগ্ধ হন সেই বাচ্চা মেয়েটির নাচ দেখে।সে সেদিন চটুল হিন্দি সিনেমার গানের সঙ্গেই নেচেছিল।'দিল ভিল, প্যার প্যার, ম্যায় কেয়া জানু রে’র তালে তালে জন্ম হল ছন্দিত সোনালি রায়ের।মন্ত্রমুগ্ধ দর্শকরা সে দিন জানতেও পারেননি তাঁরা এক ইতিহাসের সাক্ষী রয়ে গেলেন। এক তারার জন্মলগ্ন প্রত্যক্ষ করলেন।বানিজ্য বসতে টলি লক্ষী সুচিত্রা সেনের উত্তরসূরী তৈরী হল সেদিনই সুচিত্রার সামনে।
নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী নাচতেন উদয় শংকরের দলে।নামী এডিটরের শাগরেদি করেছেন, বম্বে পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছেন যশের আশায়, অর্থের সন্ধানে।লাভ হয়নি।ফিরে এসেছিলেন কলকাতায়। কনিষ্ঠা কন্যা শিপ্রা তখন সবে চার বছরের শিশু। তাতে কী! তাকেই নামিয়ে দিলেন পাড়ায় পাড়ায় জলসার আসরে।তখন জলসা মানে সব বিশ্ববন্দিত শিল্পীরা গাইছেন।সেখানেই নাচ শুরু শিপ্রার।নাচের আসরে সেই ছোট্ট মেয়েটার নাম পাল্টে হল সোনালী রায়।এরপর সব জলসা মাতিয়ে রাখল সোনালী রায়।খেলনাবাটি খেলার বয়সেই তাকে টাকা রোজগার র জন্য নেমে পড়তে হল।
এরপর সুখেন দাসের "নয়া মিছিল" ছবির জন্য নায়িকার খোঁজ চলছে।নীলাঞ্জন সোনালী ওরফে শিপ্রাকে নিয়ে গেলেন।কিন্তু রোগা চেহারা হওয়ায় সিল্কেট হলনা নীলাঞ্জনকন্যা।স্টুডিয়ো চত্বর ছেড়ে ভগ্নমনোরথ পিতাপুত্রী যখন বাড়ির পথ ধরেছে। পিছু ডাকলেন সুচিত্রা সেনের ব্যক্তিগত মেকআপ-ম্যান হাসান জামান।আবার সেই সুচিত্রাযোগ।হাসান জামানই যেন বদলে দিল শিপ্রার ভাগ্যযোগ।হাসান জামান বললেন তরুণ মজুমদার তাঁর আগামী ছবির জন্যে প্রথম যৌবনা নতুন মুখ খুঁজছেন।
সিলেক্টেড।
কাঁচামাটির তাল নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন সন্ধ্যা রায়! অস্থায়ী স্টেজের অখ্যাত এক রোগাসোগা শিশুশিল্পীকে অপত্য স্নেহে অভিনয়ের পাঠ স্টাইল গ্রুমিং সব দিয়ে তরুন সন্ধ্যা গড়ে তুললেন দেবী মূর্তি শিপ্রা সোনালী থেকে মহুয়া রায়চৌধুরী।
শ্রীমান পৃথ্বীরাজ-এর বউ থেকে প্রেয়সী হবার যাত্রা শুরু হল নতুন নামে।বাংলা চলচ্চিত্রে নায়িকা অধ্যায়ে নবতম সংযোজনের নামকরণ করা হল মহুয়া রায়চৌধুরী।মহাতারকা ব্লকবাস্টার নায়িকা।
কিন্তু সত্তর দশকের মাঝে উত্তম কুমার র সঙ্গে "সেই চোখ","বাঘবন্দী খেলা","আনন্দ মেলা" র মতো ছবি করেও মহুয়ার ক্যারিয়ারে ঢলতি চলে আসে।তখন বিভিন্ন ছবি "মাদার" "কবিতা" ছোট খাটো রোলও করতেন মহুয়া।ঘুরে দাড়ালেন আবার তরুন মজুমদারের হাত ধরে আশি সালে "দাদার কীর্তি" র সরস্বতী হয়ে।আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।বানিজ্য বসতে মহুয়া হয়ে দাড়ালেন তিনি।তাঁর ছবি পোষ্টারে থাকলেই হল হাউসফুল।
অগ্নিদগ্ধ হয়ে অকাল আকস্মিক মৃত্যুতে চলে যাবার পর শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিল। সেটা তপন সিনহার কাছেই রয়ে গেল। আদমী অউর অউরত তে কি অসাধারন অভিনয়।
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় একবার ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন‚ তাঁদের মা খুব কষ্ট করে বড় করেছিলেন তাঁদের। স্টুডিওতে ঘুরে ঘুরে শাড়ি বিক্রি করতেন বলিউড তারকা বিশ্বজিৎ জায়া রত্না চট্টোপাধ্যায়।একদিন তাঁকে ওই অবস্থায় দেখে মহুয়া রায়চৌধুরী সব শাড়ি একবারে কিনে নিয়েছিলেন।এরকমই ছিলেন মহুয়া।দিলীপ রায় পরিচালিত অপর্না সেন অভিনীত বিতর্কিত ছবি "নীলকন্ঠ"।এক বোনের সোনাগাছির পতিতা হয়ে যাওয়া ও তাকে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার গল্প।তাতে ছিলেন মমতা শংকর মহুয়া লিলি আরো অনেকে। "নীলকন্ঠ" তে প্রসেনজিৎকে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন মহুয়াই।
আজ 24 সেপ্টেম্বর বাংলা ছবির রূপোলী পর্দার সোনার প্রতিমার জন্মদিন।

No comments:

Post a Comment

সেরা পোস্ট

সেই রাতটা! (পুরো গল্প) শোভন নস্কর

- হ্যালো? সমীর ? বল ভাই কেমন আছিস? ফোনেই পাওয়া যায় না তোকে ! - হ্যাঁ এখন একটু ব্যস্ত থাকি আজকাল । বাবা ব্যবসায় ঢুকিয়ে দিয়েছে । - ভালো ...